চট্টগ্রাম মহানগরে গত দেড় দশকে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড ও গুমের অভিযোগ উঠে এসেছে। স্থানীয় ও জাতীয় সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনেও ওই সময়কার রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, গ্রেপ্তার ও বিচারবহির্ভূত হত্যা সংক্রান্ত ধারাবাহিক খবর উঠে এসেছে—বলেছে সংশ্লিষ্টরা। আয়োজিত তথ্যে দাবি করা হয়েছে, এ সময়ে অন্তত ৪০ জন নেতাকর্মী খুন-গুমের শিকার হয়েছেন; এদের মধ্যে ২৫ জন জামায়াত/ছাত্রশিবিরের এবং বাকি বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের বলে দাবি করা হয়েছে।
নিহতরা বিভিন্নভাবে হত্যা বা গুমের শিকার হয়েছেন—কেউ বাসা থেকে তুলে নেয়া হয়েছে, কেউ নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে খুন হয়েছেন, আবার রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় গুলিবিদ্ধও হয়েছেন। পরিবার, দলীয় সূত্র ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদনে এমননিই বলা হয়েছে।
উজ্জ্বল কিশোর থেকে শিক্ষার্থী—নীরব মৃত্যুর কাহিনি
২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আবদুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন রায়কে ঘিরে শহরে প্রতিবাদ-মিছিলে পুলিশের গুলিতে তিন জন নিহত হন। একই দিন পাহাড়তলীতে ছাত্রশিবির নেতা ইমরান খানও পুলিশের বুলেটে প্রাণ হারান; আগ্রাবাদের শফিক ও দেওয়ানহাটের আফজালও নিহত হন। ঘটনার পর ইমরানের লাশ দুই ঘণ্টা রাস্তায় পড়েছিল বলে অভিযোগ আছে।
ওই বছরের আরেকটি কেস—আবিদ (চট্টগ্রাম সিটি কলেজ)—পরবর্তীতে আটক ও নির্যাতনের অভিযোগের পর পীড়াদায়কভাবে খুন বলে দলীয় ও পরিবার সূত্র জানায়। ২০১৫ সালে চবি অনার্স প্রথম বর্ষের সাকিবুল ইসলামও পুলিশি নির্যাতনের ফলে প্রাণ হারান; তিনি পরিবারে একমাত্র ছেলে ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কোটা আন্দোলনের সময়ওমরগণি এমইএস কলেজের ছাত্র ফয়সাল আহমেদ শান্ত গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন—পুলিশি বাধা অতিক্রম করে তার দেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দাফন করা হয়।
বিএনপি নেতা–কর্মীদের ওপর নির্যাতন ও গুমের অভিযোগ
শুধু হত্যাকাণ্ড নয়; গুম ও অপহরণ, নির্যাতন ও দেহে স্থায়ী ক্ষতি—এসব অভিযোগও উঠে এসেছে। যেমন, শহরের সাবেক ছাত্রদল যুগ্ম সম্পাদক সাইফুল ইসলাম সাইফ—তার কথায় ২০২১ সালের ১৬ জুন পুলিশের সোর্সের ফাঁদে পড়ে তাকে অপহরণ করে পাহাড়ে নিয়ে গুলি করা হয়; আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে গেলে একটি পা কেটে দেওয়া হয়। পরে সাজানো মামলা দিয়ে তাকে কারাবন্দি করা হয়; বর্তমানে পা-বিহীন অবস্থায় জীবিকা যাপন করছেন তিনি। তিনি ছয় পুলিশ সদস্য ও এক সোর্সের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন।
২০১৩ সালের ১৯ মে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে যুবদল নেতা হুমায়ুন কবীর আহত হন এবং পরদিন মারা যান। ২০১৭ সালের ৩ ডিসেম্বর কদমতলীর অফিসে বসা অবস্থায় পরিবহন ব্যবসায়ী ও যুবদল নেতা হারুন চৌধুরীকে গুলিতে হত্যা করা হয়। ২০১৭ সালের ২৯ মার্চ রাতে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের তৎকালীন সহ-সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলমকে পুলিশ পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়; পরদিন তাঁর লাশ কর্ণফুলী নদীর কূল থেকে উদ্ধার করা হয়। মামলায় পরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নামও উঠে আসে; নিহতের স্ত্রী ২০২৪ সালে নতুন অভিযোগ দায়ের করেছেন।
নগর যুবদলের নেতা-মণ্ডলীর দাবি—শেখ হাসিনার শাসনকালে তাদের বহু নেতাকর্মী হত্যা ও গুমের শিকার হয়েছেন। তারা বলেন, সরকারি বাহিনী, পুলিশ ও অপ্রাতিষ্ঠানিক গ্রুপ মিলে বিরোধী শক্তিদের ওপর কাঠামোগতভাবে অত্যাচার চালিয়েছে এবং ন্যায়বিচার দেওয়া হয়নি।
মাদরাসা ‘বিস্ফোরণ’ ও পুলিশি অভিযানের বিতর্ক
২০১৩ সালের ৭ অক্টোবর লালখান বাজারের জামেয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়া মাদরাসায় ল্যাপটপ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ এটিকে দুর্ঘটনা বলে জানিয়েছিল। তবে পরে প্রশাসন ও পুলিশ ঘটনাটি ‘বোমা বিস্ফোরণ’ হিসেবে প্রচার করে এবং মাদরাসা ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা করে। মাদরাসার আচার–আচরণ ও আদর্শ ওপর এ অভিযানে ছাত্রসহ কয়েকজন আটক-নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। মাদরাসার নেতৃত্ব ও স্থানীয়রা দাবি করেন, প্রশাসন একটি দুর্ঘটনাকে ‘জঙ্গি নাটক’ বানিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছে।
জুলাই আন্দোলন—ছাত্রসংঘর্ষে ছয়জন নিহত
২০২৪ সালের ১৬ ও ১৮ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় মুরাদপুর ও বহদ্দারহাটে ছাত্র-শাসনজোট ও ছাত্রলীগ/যুবলীগ ক্যাডারদের সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ছয়জন নিহত হন এবং শতাধিক আহত—যাদের মধ্যে অধিকাংশ গুলিবিদ্ধ ছিলেন। নিহতরা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ছাত্রসহ পথচারীও ছিলেন। পরিবার, সহপাঠী ও স্থানীয়রা বলছেন—এতে ছাত্রসংগঠন ও প্রশাসনের সহমিশ্র আচরণ ভূমিকা রেখেছিল।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়া
চসিক মেয়র ও তৎকালীন নগর বিএনপি সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, শাসনকালে চট্টগ্রাম জুড়ে বিরোধী নেতাকর্মীদের ওপর অপেক্ষাকৃত বেশি নির্যাতন হয়েছে এবং অনেক পরিবার আজও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়। তৎকালীন নগর জামায়াতের আমির শাহজাহান চৌধুরী বলছেন, সরকারি নিপীড়ন ইতিহাসে নৃশংস অধ্যায় হিসেবে টিকে থাকবে; তাদের দাবি—অপরাধীদের বিচার হবে।
উপরোক্ত প্রতিবেদনটি পরিবারের কথা, দলীয় সূত্র ও মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনসমূহের তথ্য বিবেচনায় তৈরি—উক্ত অভিযোগ ও দাবি কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া এখানে সংযুক্ত করা হয়নি।







