রাজধানীর মিরপুর রূপনগর শিয়ালবাড়িতে গার্মেন্ট ভবন ও একটি রাসায়নিক গুদামে ভয়াবহ আগুনের বিস্তার ২৮ ঘণ্টা চেষ্টার পর নিয়ন্ত্রণে এসেছে। বুধবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক হলেও অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ এখনও জানা যায়নি। ঘটনাস্থল থেকে ১৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে এবং মালিকপক্ষের কেউ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেল কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম নিশ্চিত করেছেন যে টানা ২৮ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। অভিযান চলাকালীন পাঁচটি ইউনিট সক্রিয় ছিল। গত মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শিয়ালবাড়ির ৩ নম্বর সড়কে টিনশেড গুদামে আগুন লেগে বিস্ফোরণ ঘটায়; এ বিস্ফোরণের আগুন পাশের চারতলা ভবনের দুই তলায় ছড়িয়ে পড়ায় ভয়াবহ রূপ নেয়।
ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধারকৃত লাশের পাশাপাশি গুদামের ভেতরে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ায় আশপাশের লোকজনের জন্য বিপদজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। গুদামের ভবনে ফাটল দেখা দেয়ায় স্ট্রাকচারাল নিরাপত্তার উদ্বেগ থেকে ফায়ার সার্ভিস পুরোপুরি তল্লাশি চালিয়ে উঠতে পারেনি। ভবনের মূল দরজাটি তালাবদ্ধ ছিল; সেটি কেটে খুলে সার্চ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল।
ঘটনার পর বিস্ফোরক অধিদপ্তরের দায়-দায়িত্ব ও তদারকির ওপর প্রশ্ন উঠেছে, কারণ আলম ট্রেডার্স নামের ওই গুদামের বাইরে কোনো সেফটি ডেটা শিট (এসডিএস) পাওয়া যায়নি। নিয়ম অনুযায়ী রাসায়নিক গুদামে এসডিএস থাকা বাধ্যতামূলক। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, ওই গুদামটি তাদের “অবৈধ প্রতিষ্ঠানের” তালিকায় ছিল এবং তিনবার নোটিশও জারি করা হয়েছিল; গুদামটি অভিযান-পর্যায়ে ছিল।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, মালিক ও কর্মচারীরা পলাতক রয়েছে। তার মোবাইলেও পৌঁছানো যাচ্ছে না; সেনাবাহিনী, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা তাদের খুঁজছে। তিনি আরও বলেন, গুদামের ভেতরে থাকা রাসায়নিকের ধরন, তাপমাত্রা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা তদন্তে নেয়া হবে।
ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মো. নজমুজ্জামান জানিয়েছেন যে গুদামের ভেতরে প্রচণ্ড ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাস ছিল, যা শ্বাস নিলে ত্বক, ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। তারা সতর্ক করে বলেছেন যে অনিয়মিতভাবে ও ভুলভাবে রাসায়নিক মজুত করলে তা বড় ধরনের বিস্ফোরণ সৃষ্টি করতে পারে — এমনকি সামান্য স্পার্কেও ভয়াবহ ফল হতে পারে।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন, এই ধরনের রাসায়নিক গুদাম দ্রুত নিবাসিক এলাকা থেকে সরানো উচিত। তিনি দ্রুত তদন্ত ও দায়ীদের বিচার দাবি করেন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দ্রুত তদন্ত শুরু করবে বলে জানানো হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস বর্তমানে কেমিক্যাল ড্রেন আউট ও কুলিং পদ্ধতিতে কাজ করছে। তারা জানিয়েছে, সম্পূর্ণ নির্বাপন ও নিরাপদ তল্লাশা করতে ৩৬ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগতে পারে, এবং ভবনের স্ট্রাকচারাল মূল্যায়ন প্রয়োজন।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন যে মিরপুর, পুরান ঢাকা, তেজগাঁও ও রূপনগরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ বা অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক গুদাম থাকা নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায়। সেখানে ব্লিচিং পাউডার, ফসফেট, ক্লোরিন, হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডসহ ক্ষতিকর পদার্থ মজুদ করা হয়, যা আগুন লাগলে বিপজ্জনক বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।
বাশিত হয়েছেন, ২০০৯ সালের নিমতলী আগুনে ১২৪ জনের প্রাণহানির বড় দূর্ঘটনার পরও ঠিকঠাক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। যদিও ২০১৮ সালে কেরানীগঞ্জে রাসায়নিক পল্লী নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, প্রকল্পটির অগ্রগতি ধীরগতির কারণে তেমন ফল পাওয়া যায়নি—আর তাই একই ধরনের ঝুঁকি পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা বজায় রয়েছে।
স্থপতি ও নগরবিদ ইকবাল হাবিব মন্তব্য করেছেন, এ ধরনের ঘটনা নগর পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক গাফিলতির ফল; অবৈধ গুদামগুলো শহরের মধ্যে গড়ে উঠে তা ‘টাইম বোমা’সদৃশ। নির্বাহী কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে এখন দ্রুত ব্যবস্থা করে এমন গুদামগুলো চিহ্নিত, সরিয়ে ও কঠোর রেগুলেশন নিশ্চিত করতে হবে বলে তিনি বলেছেন।
