জুলাই বিপ্লবের সময় রাজধানীর যে কয়টি সরকারি হাসপাতালে সর্বাধিক হতাহত পৌঁছেছিল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছিল তাদের অন্যতম। হাসপাতালের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত তিন শতাধিক আহত এবং ৪৭ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়। তবে সেই সময় চিকিৎসাসেবা দেওয়া চিকিৎসক ও নার্সদের দাবি— প্রকৃত সংখ্যা ছিল তার অন্তত দুই থেকে তিনগুণ বেশি।
তাদের অভিযোগ, তৎকালীন আওয়ামীপন্থি হাসপাতাল পরিচালক ডা. শফিউর রহমান সরকারের নির্দেশে হতাহতের প্রকৃত পরিসংখ্যান গোপন করতে নিবন্ধন বইয়ের বহু পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলেন এবং নতুন বইগুলোও গায়েব করেন। শেখ হাসিনা সরকারের নির্দেশেই তিনি এমন কাজ করেন বলে অভিযোগ করেন হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসক। তারা জানান, আহতদের চিকিৎসায় ব্যস্ত থাকার সময় পরিচালক ও তার অনুসারীরা তথ্য গোপনে মরিয়া ছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, এসব কর্মকাণ্ডের পরও রাজনৈতিক যোগসাজশের কারণে ডা. শফিউরকে তখন শাস্তি দেওয়া হয়নি। বরং বিএনপি–জামায়াতপন্থি চিকিৎসকদের নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তিনি পদে বহাল ছিলেন। অবশেষে ২০২৫ সালের ১০ আগস্ট তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে সাভারের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ ম্যানেজমেন্টে (বিআইবিএম) বদলি করা হয়।
১৮ জুলাই থেকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে মৃত ও আহতদের ঢল নামে। সার্জারি ও অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের আট চিকিৎসক, তিন নার্স এবং দুই ওয়ার্ডবয়ের সাক্ষ্য অনুযায়ী, সেদিনই শতাধিক মানুষকে মৃত বা আহত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। আহতদের অনেকে চিকিৎসা শুরুর আগেই মারা যান। শুধু ১৯ জুলাইই মৃত অবস্থায় ৩৩ জন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৫–৩০ জন মারা যান। পরের দিন এক শিফটে ২০ জনেরও বেশি লাশ আনা হয়।
চিকিৎসক ও নার্সদের ভাষ্য, আগস্টের শুরুতে হতাহতের সংখ্যা আরও বেড়ে যায়— ৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫টি লাশ আসে হাসপাতালে। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যে তালিকা প্রকাশ করে, তাতে তার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
একজন ট্রেইনি চিকিৎসক জানান, “যে তথ্য হাসপাতাল থেকে দেওয়া হয়েছে তা বাস্তব নয়। চারদিক থেকে আহতদের ঢল নামছিল। ফ্লোরে ফ্লোরে লাশ আর আহতদের সারি। ১৮ জুলাইয়ের পর পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। নিবন্ধন বইয়ে যেসব নাম লেখা হয়েছিল, সেগুলোর কার্বন কপিও পরে গায়েব করা হয়।”
আরেক চিকিৎসক বলেন, “১৯ জুলাই মোহাম্মদপুরে হত্যাযজ্ঞের পর অন্তত ৫০টি লাশ এসেছে। কিন্তু অল্পসংখ্যকের নাম নথিভুক্ত করা হয়। ৫ আগস্ট পর্যন্ত অন্তত এক হাজার মানুষ চিকিৎসা নিয়েছেন এই হাসপাতালে। সরকারের চাপেই তথ্য গোপন করা হয়েছে— এটা নিশ্চিত।”
চিকিৎসকদের অভিযোগ, পরিচালককে সহযোগিতা করেন আওয়ামীপন্থি কয়েকজন চিকিৎসক, বিশেষ করে ডা. তানজিদ ও ডা. জ্যোতি। আহতদের চিকিৎসা দেওয়া অনেক চিকিৎসককে তখন “বিএনপি-জামায়াত ট্যাগ” দেওয়া হয়।
এক সিনিয়র নার্স বলেন, “ওসেকে আসা আহতদের মাত্র ২০ শতাংশকে আমরা চিকিৎসা দিতে পেরেছি। নাম নথিভুক্ত করারও সময় ছিল না। পরে দেখি, পরিচালক নিজে উপস্থিত থেকে নিবন্ধন বইয়ের পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলেছেন। নতুন বইও গায়েব।”
অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের প্রধান ও ড্যাব নেতা ডা. রেহান উদ্দিন খান বলেন, “বিএনপি করি বলে আমাদের বাধা দেওয়া হয়েছিল। পরিচালক নিজেই নথি ছিঁড়ে ফেলেন। হাসপাতালের দেওয়া তথ্য সত্য নয়। আহতদের সংখ্যা সহস্রাধিকের কাছাকাছি।”
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে তৎকালীন পরিচালক ডা. শফিউর রহমান বলেন, “সব তথ্য মন্ত্রণালয়ের মনোনীত কমিটি যাচাই-বাছাই করেছে। আমি অফিসিয়ালি নতুন পরিচালককে সব বুঝিয়ে দিয়েছি। আমাকে হেয় করার জন্যই এসব বলা হচ্ছে।”
সেবা তত্ত্বাবধায়ক শাহনেওয়াজ পারভীনও বলেন, “পরিচালকের নির্দেশ মতোই কাজ করেছি। তথ্য গোপন হয়েছে কিনা জানি না।”
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী লে. কর্নেল (অব.) কামাল আকবর জানান, “তথ্য গোপন ছিল— এ বিষয়ে আমাদের প্রতিনিধিরা কাজ করছেন। শুধু সোহরাওয়ার্দী নয়, অন্য হাসপাতালেও প্রমাণ নষ্ট করা হয়েছে। প্রশাসনিক পর্যায়ে দায় খতিয়ে দেখা উচিত।”
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাইদুর রহমান বলেন, “এটি যদি সত্য হয়, তা গুরুতর অপরাধ। কেউ অভিযোগ জানালে মন্ত্রণালয় গুরুত্বসহকারে তদন্ত করবে।”
