রাষ্ট্র সংস্কার বিষয়ে জুলাই সনদ চূড়ান্ত করার দীর্ঘ নয় মাসের প্রচেষ্টার পরও মতৈক্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলো জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। নানা মতপার্থক্যের মধ্যেই চূড়ান্ত প্রস্তাব সরকারের হাতে তুলে দিয়ে মঙ্গলবার তাদের কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘোষণা করেছে কমিশন।
প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনও মতভেদ রয়েছে সাংবিধানিক আদেশ কে জারি করবেন—রাষ্ট্রপতি না প্রধান উপদেষ্টা—এই প্রশ্নে। একইভাবে গণভোটের সময় নিয়েও কোনো ঐক্যমত্য হয়নি। কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, গণভোটের সময় নির্ধারণের ক্ষমতা এখন সরকারের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের হাতে থাকবে।
উচ্চকক্ষের অনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতি নিয়েও বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র অবস্থান ভিন্ন। রাজনৈতিক দলের প্রধানের সরকারপ্রধান হওয়ার সুযোগ, গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং মৌলিক সংস্কারসংক্রান্ত একাধিক ইস্যুতে বিএনপি লিখিত আপত্তি (নোট অব ডিসেন্ট) জানিয়েছে।
কমিশন প্রস্তাব করেছে—আগামী সংসদ ২৭০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করতে না পারলে প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে। এ বিষয়েও বিএনপি কঠোর আপত্তি জানিয়েছে।
গণভোট ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া
গতকাল যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ সুপারিশপত্র হস্তান্তর করে কমিশন। পরে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের সহসভাপতি ড. আলী রীয়াজ বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন।
তিনি জানান, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য কমিশন তিন ধাপের প্রস্তাব দিয়েছে—
১️⃣ প্রথমে সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ জারি,
২️⃣ এরপর গণভোট আয়োজন,
৩️⃣ সবশেষে নতুন সংসদকে সাংবিধানিক পরিষদের দ্বৈত ভূমিকা দিয়ে সংবিধান সংস্কার অন্তর্ভুক্তি।
প্রস্তাব অনুযায়ী, আদেশ জারির পর থেকে জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত যেকোনো দিন গণভোট করা যাবে। তবে দিনক্ষণ নির্ধারণের দায়িত্ব সরকারের।
ড. আলী রীয়াজ বলেন,
“আমরা চাই জনগণের সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে যাক। গণভোটের মাধ্যমে জনগণের রায়ই হবে চূড়ান্ত।”
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ অভিযোগ করেছেন,
ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার বদলে কমিশন অনৈক্য বাড়ানোর চেষ্টা করেছে।”
দলের আরেক নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন,
“জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে হতে হবে—এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।”
অন্যদিকে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান,
> “জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট ছাড়া সনদ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। নির্বাচনের দিন গণভোটের দাবি যারা করছে, তারা মূলত সনদটিকে অকার্যকর করার পথে হাঁটছে।”
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সতর্ক করে বলেন,
>“ক্ষমতার লোভে জাতীয় ঐক্য ভাঙার চেষ্টা করলে তার ফল ভালো হবে না। জনগণের আস্থা হারাবে সরকার।
প্রস্তাবের মূল দিকগুলো
কমিশনের ৮৫টি সুপারিশের মধ্যে—
৯টি নির্বাহী আদেশে,
২৮টি অধ্যাদেশে,
এবং ৪৮টি সংবিধান-সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবে বাস্তবায়নের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।
সংবিধান-সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবগুলো নিয়ে দুটি বিকল্প বাস্তবায়নপথ রাখা হয়েছে—
১️⃣ গণভোটের আগে পূর্ণাঙ্গ খসড়া বিল অনুমোদনের জন্য জনগণের রায় নেওয়া,
২️⃣ গণভোট-পরবর্তী সংসদকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে দ্বৈত ক্ষমতা প্রদান।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ ২৭০ দিনের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হলে বিলটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে।
কমিশনের অবস্থান
কমিশন সদস্যরা জানিয়েছেন,
জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এই সুপারিশ তৈরি করা হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই—রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাবগুলো যেন আইনি ভিত্তি পায় এবং জনগণের অনুমোদনের মধ্য দিয়ে টেকসই সংস্কার নিশ্চিত হয়।
ড. আলী রীয়াজ আশা প্রকাশ করেন,
“যেসব দল এখনো সনদে সই করেনি, তারা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দেখে সিদ্ধান্ত নেবে। আমরা আশাবাদী, শেষ পর্যন্ত সবাই ঐকমত্যে আসবে।”
