গেল বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে ভারতে অবস্থানরত নিষিদ্ধ ঘোষিত দলটির প্রধান শেখ হাসিনাসহ অন্য পলাতক নেতারা ভয়ভীতি ও উসকানিমূলক বার্তা প্রচার করে আসছেন। ভারতে বসে দলের নেতাকর্মীদের ভয়েস কলে নাশকতার দিকনির্দেশনাও দেওয়া হচ্ছে বলে সরকারের কাছে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে ‘জুলাই গণহত্যা মামলায়’ শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড এবং ঢাকার বিশেষ আদালতে দুর্নীতির চার মামলায় মোট ২৬ বছরের কারাদণ্ডের রায় আসে।
গোয়েন্দা সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ নতুন করে চক্রান্ত শুরু করেছে। নির্বাচনে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি ও ভোট বানচালের অপচেষ্টায় প্রতিবেশী দেশ থেকে পলাতক নেতারা ৩২টি সীমান্তবর্তী আসনে গোপনে প্রবেশের চেষ্টা করতে পারে। এসব এলাকায় ভয়ভীতি প্রদর্শন, সহিংসতা ও উত্তেজনা তৈরির মাধ্যমে ভোটের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত করার আশঙ্কা রয়েছে।
অস্ত্র, চরমপন্থি গ্রুপ ও সংখ্যালঘু অংশে অস্থিতিশীলতার পরিকল্পনা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—
সীমান্তবর্তী আসন সংখ্যা ৬২টি, যার মধ্যে ৩২টি আসনে সংখ্যালঘু জনসংখ্যা ১০%–এর বেশি।
১০টি আসনে চরমপন্থিদের এবং ৩টি আসনে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা রয়েছে।
আওয়ামী লীগ এসব গ্রুপকে ব্যবহার করে নির্বাচনী সহিংসতা উসকে দিতে পারে।
ভারত থেকে অবৈধ অস্ত্র এনে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা বাড়ানোর ঝুঁকিও আছে।
গত বছরের পটপরিবর্তনের সময় দেশের বিভিন্ন থানায় হামলা চালিয়ে ৫,৭৬৩টি অস্ত্র লুট হয়েছিল। উদ্ধার হয়েছে ৪,৪২৩টি, এখনো ১,৩৪০টি অস্ত্র নিখোঁজ। এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দেয়া ১০,৫০৬টি অস্ত্র লাইসেন্সের মধ্যে ৬৫৭টি অস্ত্র জমা পড়েনি, যেগুলোর একটি বড় অংশ অপরাধীদের হাতে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঝুঁকি
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ২,৬৮৫টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর, যার ৭৬% রাজনৈতিক কারণে। গোয়েন্দা সংস্থা আশঙ্কা করছে—
আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না এলে তাদের ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত সংখ্যালঘুরা ভোটদান থেকে বিরত থাকতে পারেন।
এ সুযোগে উসকানি দিয়ে বসতবাড়ি ও উপাসনালয়ে হামলা চালিয়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা হতে পারে।
ডিজিটাল অপতৎপরতা ও এআই ব্যবহার
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনকে বিভ্রান্ত করতে এআই ব্যবহার করে—
ডিপফেক ভিডিও,
নকল ভাষণ,
ভুয়া বার্তা
প্রচার করতে পারে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতারা।
এছাড়া বট ও ফেক আইডি দিয়ে প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর উদ্যোগও রয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দলও বড় বাধা
সব রাজনৈতিক দলের মধ্যেই কমবেশি অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব রয়েছে। আধিপত্য বিস্তার ও স্বার্থসংঘাতের কারণে এসব কোন্দল নির্বাচনী সহিংসতা বাড়াতে পারে।
বিএনপির অন্তর্দলীয় কোন্দলে পরিবর্তনের পর থেকে শতাধিক নিহত এবং ২,০০০–এর বেশি আহত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
বদিউল আলম মজুমদার বলেন—
ভারত থেকে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের দেশে ঢোকার আশঙ্কা রয়েছে; সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। সঠিকভাবে কাজ করতে পারলে অনেক ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।
সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম বলেন—
পলাতক নেতাদের অনুপ্রবেশ ও ভেতরে থাকা নেটওয়ার্ক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে অবনতির দিকে ঠেলে দিতে পারে।
তিনি মনে করেন, পুলিশ, বিজিবি এবং সেনাবাহিনী সতর্ক থাকলে তাদের অপতৎপরতা ব্যর্থ হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহফুজুর রহমান বলেন—
আওয়ামী লীগ সীমান্ত এলাকাসহ দেশের যেকোনো জায়গায় গোলযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
পেশিশক্তি ও অস্ত্র ব্যবহার করে সহিংসতা ছড়ানোর আশঙ্কা আছে।
এছাড়া বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সম্পর্ক খারাপ হওয়ায় নির্বাচন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে।
অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন—
সুষ্ঠু নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বাধা দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল।
নির্বাচন কমিশন এআই–সংক্রান্ত ঝুঁকি মোকাবিলায় এখনো প্রস্তুতি নেয়নি।
পলাতক নেতাদের অনুপ্রবেশ ঠেকানো এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কঠোর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতি
পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) বলেন—
সব ধরনের ঝুঁকি মাথায় রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে।
তফসিল ঘোষণার পর অভিযান আরও জোরদার হবে।
তিনি জানান, নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা বজায় রাখতে পুলিশ সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
