জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পতন ঘটলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শেখ পরিবারের নামে থাকা স্থাপনাগুলো এখনো বহাল রয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও ফ্যাসিবাদের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত এসব স্থাপনার নাম পরিবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ পরিবারের নামে একাধিক হল, আবাসিক ভবন ও অবকাঠামো রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, বঙ্গবন্ধু টাওয়ার ও শেখ রাসেল টাওয়ার। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সভা-সেমিনার কক্ষ, বাগান ও অন্যান্য স্থাপনাও শেখ পরিবারের সদস্যদের নামে নামকরণ করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে এসব নাম রাজনৈতিক আধিপত্য ও একদলীয় কর্তৃত্বের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেই শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটলেও প্রশাসনের নীরবতায় এসব চিহ্ন এখনো টিকে আছে।
এদিকে, আওয়ামী ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠস্বর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদিকে হত্যার ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এই হত্যাকাণ্ডের পর বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘ফ্যাসিবাদের চিহ্নমুক্ত’ করার দাবি আরও জোরালো হয়। এরই ধারাবাহিকতায় শেখ পরিবারের নামে থাকা স্থাপনাগুলোর নাম পরিবর্তনের দাবি নতুন করে সামনে আসে।
শিক্ষার্থীরা জানান, জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন নাম বহাল রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এই প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শেখ মুজিবুর রহমান হল’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ এবং ‘বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘ফেলানী হল’ করার দাবিতে উপাচার্যের প্রশাসনিক ভবন ঘেরাও কর্মসূচি পালন করে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)।
গতকাল রোববার দুপুরে ডাকসু নেতারা, বিভিন্ন হল সংসদের প্রতিনিধি এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেন। এ সময় তারা ‘ফ্যাসিবাদের আস্তানা, ঢাবিতে থাকবে না’, ‘মুজিববাদ মুজিববাদ, মুর্দাবাদ মুর্দাবাদ’সহ নানা স্লোগান দেন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে একটি স্মারকলিপিও জমা দেওয়া হয়।
ঘেরাও কর্মসূচিতে ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের বলেন, ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনও স্বৈরতান্ত্রিক ছিল। হাসিনার পতনের পর সেই স্বৈরাচারের প্রতীক হিসেবে মুজিবের কোনো চিহ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাখা যাবে না। পাশাপাশি ফ্যাসিবাদের সব চিহ্ন উপড়ে ফেলতে হবে।
জুলাই অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত শিক্ষক-কর্মকর্তাদের শাস্তির দাবিও জানান তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে যেসব শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী গণহত্যার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন বা অপরাধে জড়িত ছিলেন, তাদের দ্রুত প্রশাসনিক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
ডাকসুর সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক মোসাদ্দেক আলী ইবনে মুহাম্মদ বলেন, মুজিব হলের নাম পরিবর্তন করে শহীদ ওসমান হাদি হল এবং ফজিলাতুন্নেছা হলের নাম পরিবর্তন করে ফেলানী হল করার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে জুলাই গণহত্যায় সমর্থন দেওয়া শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও উত্থাপন করা হয়েছে। তবে এখনো প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাতে শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শেখ মুজিবুর রহমান হলের নামফলকের ওপর ‘শহীদ শরীফ ওসমান হাদি হল’ লেখা নামফলক স্থাপন করেন হল সংসদের ভিপি ও জিএস। একই দিনে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে হলের নাম পরিবর্তনের দাবি জানান।
অন্যদিকে, ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের নাম পরিবর্তনের দাবিকে কেন্দ্র করে হল সংসদের ভেতর আপত্তি দেখা দিয়েছে। হলের ভিপি তাসনিম আক্তার নাবিলা অভিযোগ করেন, হল সংসদের সঙ্গে আলোচনা না করেই ডাকসু কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এ বিষয়ে জবাব চাওয়া হয়েছে। এ নিয়ে গতকাল রাতে হল সংসদের সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক মিফতাহুল জান্নাত রিফাত ফেসবুকে লেখেন, হলের নাম পরিবর্তন নিয়ে তারা একমত ছিলেন এবং শিক্ষার্থীদের মতামতও সংগ্রহ করা হচ্ছিল। তবে ডাকসুর অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে পোস্ট দেওয়ার আগে তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। তাই চাপিয়ে দেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত তারা মানবেন না।
তিনি আরও জানান, শিক্ষার্থীদের ভোটে ‘ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম হল’ নামটি সর্বোচ্চ সমর্থন পেয়েছে, যা একজন বীর প্রতীক ও নারীদের সংগ্রামের প্রতীক। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছে ‘ফেলানী হল’ নামটি।
ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, বিতর্কিত নাম পরিবর্তন করাই মূল লক্ষ্য। এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কোন নাম হবে, তা শিক্ষার্থীদের মতামতের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত করা হবে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল’ নাম থেকে ‘জাতির জনক’ ও ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দ দুটি বাদ দেওয়া হয়। তবে পুরো নাম পরিবর্তনের দাবি তখনও বহাল ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, এসব দাবির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।







