বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্রমেই অস্থিরতা ও উদ্বেগের আবহ ঘনীভূত হচ্ছে। গত বছরের ৫ আগস্টের ছাত্র–জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের মৌলিক অধিকার প্রশ্নে যারা আপসহীন অবস্থান নিয়েছেন, তারাই এখন টার্গেটে পরিণত হচ্ছেন। বিশেষ করে ভারতের একপাক্ষিক নীতি ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে রাজপথ ও লেখনীর মাধ্যমে সোচ্চার ব্যক্তিদের স্তব্ধ করতে একটি সুপরিকল্পিত ‘নীলনকশা’ বাস্তবায়নের ইঙ্গিত পাচ্ছে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো।
সম্প্রতি ইনকিলাব মঞ্চের সংগঠক শরীফ ওসমান হাদির ওপর প্রকাশ্য দিবালোকে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম মাসুদের গুলিবর্ষণের ঘটনা এই আশঙ্কাকে রাজপথ থেকে নীতিনির্ধারণী মহল পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দিল্লির প্রভাবমুক্ত স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির দাবি তোলা ব্যক্তিরাই এখন একটি বিশেষ হিটলিস্টের লক্ষ্যবস্তু।
এই প্রেক্ষাপটে জুলাই যোদ্ধা, আন্দোলনের সমন্বয়ক, সংসদ-সদস্য প্রার্থী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা জোরদারে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে জুলাই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া কয়েকজন সম্মুখসারির নেতাকে গানম্যান দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তাদের ব্যক্তিগত অস্ত্রের লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
গানম্যানপ্রাপ্তদের তালিকায় রয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা এবং উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম।
এছাড়া আরও বেশ কয়েকজন রাজনীতিক ও সংসদ-সদস্য প্রার্থী গানম্যান ও অস্ত্রের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছেন। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাছে গানম্যান চেয়েছেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শিগগিরই কয়েকজন রাজনীতিককে গানম্যান ও অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এই তালিকায় আরও রয়েছেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জুনায়েদ সাকি, ডেমরা–যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে বিএনপি মনোনীত সংসদ-সদস্য প্রার্থী তানভির আহমেদ রবিন, পাবনা-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী জাফির তুহিন, জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদসহ আরও কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা।
এদিকে ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে শহীদ শরীফ ওসমান হাদির পরিবারকেও বিশেষ নিরাপত্তার আওতায় আনা হচ্ছে। তার এক বোনকে গানম্যানসহ অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হবে এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের জন্য সার্বক্ষণিক পুলিশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন সূত্রে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, “জুলাই যোদ্ধা ও সংসদ-সদস্য প্রার্থীদের মধ্যে যারা নিরাপত্তার আবেদন করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”







