বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে গত বছরের ৫ আগস্ট কুমিল্লার বিভিন্ন থানা থেকে ১৭টি অস্ত্র লুট হয়। দীর্ঘ সময় পার হলেও এসব অস্ত্র এখনো উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। এতে জনসাধারণের মধ্যে নীরব আতঙ্ক বিরাজ করছে। এরই মধ্যে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই জেলার ভারত সীমান্ত দিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র প্রবেশের তথ্য সামনে এসেছে, যা উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে মাদকবিরোধী অভিযানে সীমান্ত এলাকা থেকে নেশাজাতীয় দ্রব্যের পাশাপাশি কয়েকটি প্রাণঘাতী অস্ত্র উদ্ধার হওয়ায় জনমনে ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে।
পুলিশের খোয়া যাওয়া অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তৈরি হলে জেলা প্রশাসন কিছুটা তৎপরতা দেখায়। গত অক্টোবরে কুমিল্লা জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকে বিদায়ী জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে লুট হওয়া অস্ত্রের হালনাগাদ তথ্য জানতে চাওয়া হলে তারা নানা অজুহাতে বিষয়টি এড়িয়ে যান। তবে বৃহস্পতিবার কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাশেদুল হক চৌধুরী স্বীকার করেন, ১৭টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
বিভিন্ন গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, লুট হওয়া অস্ত্রগুলো কার কাছে আছে, কী অবস্থায় রয়েছে কিংবা আদৌ উদ্ধার করা যাবে কি না—এসব বিষয়ে পুলিশের কাছে সুস্পষ্ট তথ্য নেই। একই সঙ্গে নির্বাচনের প্রাক্কালে নতুন করে অস্ত্র প্রবেশের তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। আগে কুমিল্লার ত্রিপুরা সীমান্ত দিয়ে মূলত মাদক পাচারের ঘটনা ঘটলেও সম্প্রতি আগ্নেয়াস্ত্র পাচারের ঘটনাও সামনে এসেছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) অভিযানে মাদকের সঙ্গে কয়েকটি অস্ত্র উদ্ধার হওয়ায় বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
গত মাসে বিজিবির এক অভিযানে মাদকসহ কয়েকটি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। বিজিবির দাবি, কুমিল্লায় এ ধরনের ঘটনা এটাই প্রথম। বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচন সামনে রেখেই এসব অস্ত্রের চালান দেশে প্রবেশ করানো হচ্ছে।
বিভিন্ন সূত্রের তথ্যমতে, নির্বাচনের আগে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির লক্ষ্যে কুমিল্লার একাধিক আসনের এমপি প্রার্থীদের টার্গেট করা হচ্ছে। এর মধ্যে কুমিল্লা-৪ আসনের একটি প্রার্থীর নাম আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, তাকে ঘিরে হুমকির ঘটনাও ঘটেছে।
তফসিল ঘোষণার পর ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে নিষিদ্ধ সংগঠনের কিছু নেতাকর্মীর তৎপরতা বাড়তে দেখা গেছে। গত কয়েক মাসে তারা দফায় দফায় ঝটিকা মিছিল করে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব কর্মকাণ্ডে পলাতক কিছু নেতার আর্থিক সহায়তার কথাও শোনা যাচ্ছে।
কুমিল্লা সীমান্তঘেঁষা ত্রিপুরা রাজ্য। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কুমিল্লা সীমান্ত দিয়েই অনেকে ভারতে আশ্রয় নেয় বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এসব সূত্রের দাবি, নির্বাচনকে ঘিরে অস্থিতিশীলতা তৈরির উদ্দেশ্যে সীমান্ত ব্যবহার করে অস্ত্র পাঠানোর চেষ্টা চলছে।
এ বিষয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতারা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র দ্রুত উদ্ধার না হলে এবং সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র প্রবেশ বন্ধ করা না গেলে নির্বাচনী পরিবেশ ও জননিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
কুমিল্লা ব্যাটালিয়ন (১০ বিজিবি) এর অধিনায়ক কর্নেল মীর আলী এজাজ জানান, গত মাসে গোমতী নদীসংলগ্ন গোলাবাড়ী সীমান্ত এলাকায় রাতের অন্ধকারে মাদকের সঙ্গে একটি বিদেশি পিস্তল প্রবেশের খবর পেয়ে অভিযান চালানো হয় এবং অস্ত্রটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
এদিকে কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) রাশেদুল হক চৌধুরী বলেন, ‘আমরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অস্ত্র উদ্ধার করেছি। এখনো কিছু অস্ত্র উদ্ধার বাকি রয়েছে। এ বিষয়ে আমাদের অভিযান ও তৎপরতা অব্যাহত আছে। অস্ত্র উদ্ধারে সেনাবাহিনী ও র্যাব আমাদের সহযোগিতা করছে।’







