বছরজুড়ে খুন ও গোলাগুলির ঘটনায় উত্তপ্ত থাকা চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলা এবার ভোটের মাঠেও ব্যাপক আলোচনায় এসেছে। শেষ মুহূর্তে এই আসনে প্রার্থী পরিবর্তন করেছে বিএনপি। ৫ আগস্টের পর যাঁদের ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে, শেষ পর্যন্ত তাঁদের দুজনই মনোনয়ন পেয়েছেন। প্রথমে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও রোববার রাতে নতুন করে মনোনয়নের চিঠি পান গোলাম আকবর খোন্দকার। তবে চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে বিএনপির চূড়ান্ত প্রার্থী কে, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি।
এ বিষয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, আপাতত গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও গোলাম আকবর খোন্দকার—উভয়েই বিএনপির প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হবেন। মনোনয়ন প্রত্যাহারের সময় একজনকে চূড়ান্ত করা হবে এবং অপরজনকে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হবে। তিনি জানান, প্রার্থীদের অতীত কর্মকাণ্ড, জনপ্রিয়তা এবং এক পরিবার এক প্রার্থী নীতির আলোকে দল নতুন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

রাউজানের পাশাপাশি আরও দুটি আসনে শেষ মুহূর্তে প্রার্থী বদল করেছে বিএনপি। চট্টগ্রাম-১০ (হালিশহর-ডবলমুরিং) আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর পরিবর্তে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে সাঈদ আল নোমানকে। তিনি রাজনীতিতে নবাগত এবং এবারই প্রথম সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। একইভাবে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনেও প্রার্থী পরিবর্তন হয়েছে। তিনটি আসনে প্রার্থী বদলের কারণে চারটি আসনের ভোটের সমীকরণে প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সীতাকুণ্ডে আওয়ামী লীগ আমলে প্রায় আট বছর কারাভোগ করা বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আসলাম চৌধুরীকে শুরুতে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁর অনুসারীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন এবং তিনি এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণাও দেন। পরে প্রার্থী বদল করে আসলাম চৌধুরীকেই মনোনয়ন দেওয়ায় এই আসনে নতুন করে হিসাব পাল্টে গেছে। এতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সীতাকুণ্ড এলাকার বাসিন্দা সেকান্দর হোসাইন বলেন, মনোনয়ন নিয়ে বিভক্তি থাকলে জামায়াত লাভবান হতো। আসলাম চৌধুরী মনোনয়ন পাওয়ায় কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের অনুসারীরা দলের পক্ষে কাজ করতে পারেন। আসলাম চৌধুরী বলেন, জামায়াতকে পরাজিত করতে সবাইকে নিয়ে মাঠে কাজ করতে হবে এবং কাজী সালাউদ্দিনের সমর্থনও গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিন কোনো মন্তব্য করেননি।
এদিকে চট্টগ্রাম-১০ আসন ঘিরেও দীর্ঘদিন দ্বন্দ্ব চলছিল। আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই আসন থেকে তাঁর ছেলে ইসরাফিল খসরু চৌধুরীকে প্রার্থী করাতে চেয়েছিলেন। তবে এতে নগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান মঞ্জুর অনুসারীদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হতো এবং জামায়াত লাভবান হওয়ার আশঙ্কা ছিল। শেষ পর্যন্ত আমীর খসরুকে এই আসনে ফিরিয়ে এনে বিএনপি অভ্যন্তরীণ কোন্দল কমাতে পেরেছে বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতারা।
রাউজান আসনে প্রার্থী মনোনয়ন ঘিরে আলোচনার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সহিংসতা। গত ১৬ মাসে রাউজানে ১৮ জন খুন হয়েছেন, যার মধ্যে ১৩টি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। নিহতদের অধিকাংশই গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী অথবা গোলাম আকবর খোন্দকারের অনুসারী ছিলেন। আধিপত্য বিস্তার, বালুমহাল ও পাহাড় কাটার মাটি নিয়ে দ্বন্দ্বে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটে। একই সময়ে গুলি বিনিময়ের অন্তত ৩২টি ঘটনায় অর্ধশতাধিক মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
সর্বশেষ ৫ নভেম্বর কোয়েপাড়া গ্রামে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হন। এর আগে ২৫ অক্টোবর তিনজন, ৯ নম্বর ওয়ার্ডে যুবদল নেতা আলমগীর আলম গুলিতে নিহত হন। ৬ জুলাই কদলপুরে ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য সচিব মো. সেলিম নিহত হন। এপ্রিল, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিসহ বিভিন্ন সময়ে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ও সংঘর্ষে রাউজান রক্তাক্ত হয়েছে। এসব সহিংস ঘটনার প্রভাব এবারকার নির্বাচনে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।







