ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসাম থেকে গত তিন মাসে প্রায় দুই হাজার মানুষকে বাংলাদেশে ‘পুশ-ইন’ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। তিনি জানান, ১৯৫০ সালের একটি আইন প্রয়োগ করে এসব মানুষকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার করে পাঠানো হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, বিদেশি ট্রাইব্যুনাল কাউকে অবৈধ বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করার পর এক সপ্তাহের মধ্যেই তাকে সীমান্ত দিয়ে পুশ-ইন করা হবে। উচ্চ আদালতে আপিল করে যাতে এ প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করা না যায়, সে লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে এ সিদ্ধান্তকে ঘিরে আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রশ্ন ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাঁদের মতে, ৭৫ বছর আগের ওই আইন বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করা আইনগতভাবে বৈধ কি না, তা নিয়ে গুরুতর সংশয় রয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য
বছরের শুরুতে আসাম মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত জানাতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেন, ইমিগ্র্যান্টস (এক্সপালশন ফ্রম আসাম) অ্যাক্ট, ১৯৫০ অনুযায়ী গত কয়েক মাসে প্রায় দুই হাজার মানুষকে বাংলাদেশে পুশ-ইন করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ৩১ ডিসেম্বরই ১৮ জনকে সীমান্ত পার করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিদেশি ট্রাইব্যুনাল যাদের অবৈধ বিদেশি ঘোষণা করবে, তাদের সাত দিনের মধ্যেই পুশ-ইন করা হবে। এতে করে তারা হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে প্রক্রিয়া বিলম্বিত করতে পারবে না।
মুখ্যমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, আগে ‘অনুপ্রবেশকারী’দের শনাক্তের পর কীভাবে তাদের বহিষ্কার করা হবে—এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা ছিল না। ঘোষিত বিদেশিদের আটক শিবিরে রাখা হলেও তারা অনেক সময় জামিনে মুক্তি পেয়ে যেতেন। নতুন সিদ্ধান্তে শুধু ‘পুশ-ইন’ প্রক্রিয়াকেই কার্যকর উপায় হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পুরোনো আইন প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক
আইনজীবীরা বলছেন, ১৯৫০ সালের আইনটি একটি বিশেষ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে—দেশভাগের পর জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায়—প্রণয়ন করা হয়েছিল। বর্তমানে এই আইন প্রয়োগ করা অসাংবিধানিক।
গৌহাটি হাইকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক ভুঁইয়া বলেন, আইনটির দ্বিতীয় ধারায় কোনো নোটিশ, শুনানি বা আপিলের সুযোগ না রাখার কথা বলা হয়েছে, যা ভারতের সংবিধানের ১৪ ও ২১ নম্বর ধারার পরিপন্থী। তার মতে, এই আইন বিদেশি আইন, নাগরিকত্ব আইন বা পাসপোর্ট আইনের বিকল্প হতে পারে না এবং এর কার্যকারিতা বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে।
আরেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হাফিজ রশিদ চৌধুরীর মতে, ট্রাইব্যুনাল ও উচ্চ আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া এড়িয়ে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে পুশ-ইন করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা পুরো বিচার ব্যবস্থাকেই উপেক্ষা করার শামিল।
মানবাধিকার সংগঠনের উদ্বেগ
মানবাধিকার সংগঠন সিটিজেন্স ফর জাস্টিস অ্যান্ড পিস (সিজেপি)-এর আসাম রাজ্য ইনচার্জ পারিজাত নন্দ ঘোষ প্রশ্ন তুলেছেন, পুশ-ইন করা দুই হাজার মানুষের তালিকা কোথায়। তিনি বলেন, এদের মধ্যে কেউ ভারতীয় নাগরিক নন—এ নিশ্চয়তা কীভাবে দেওয়া হচ্ছে? অতীতে রাতের আঁধারে পুশ-ইন করা বহু মানুষ পরে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
সূত্র:বিবিসি
