ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ ছড়িয়েছে। নির্বাচন উপলক্ষে প্রার্থীদের জমা দেওয়া হলফনামায় উঠে এসেছে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা ও সম্পদের নানা চমকপ্রদ তথ্য। কারও কোটি টাকার ব্যাংক আমানত, কারও স্ত্রীর নামে বিপুল সম্পদ, আবার কারও শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক ও আলোচনা।
ইশরাক হোসেন
ঢাকা-৬ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ইশরাক হোসেনের অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা। নগদ অর্থ ও ব্যাংকে জমা রয়েছে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। কৃষি ও অকৃষিজমির মূল্য এক কোটি ৬২ লাখ টাকার বেশি। মরহুম সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাক হোসেন পেশা হিসেবে চাকরি ও ব্যবসা—উভয়ই উল্লেখ করেছেন। শিক্ষাগত যোগ্যতা উল্লেখ না করলেও তার আয়ের প্রধান উৎস চাকরি, বাড়িভাড়া ও শেয়ার ব্যবসা। বছরে তার আয় ৬২ লাখ টাকা।
আব্দুল মান্নান
ঢাকা-৬ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আব্দুল মান্নান ইশরাক হোসেনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। হলফনামায় তিনি উল্লেখ করেছেন, তার কোনো ঋণ, বাড়ি কিংবা ফ্ল্যাট নেই। নগদ অর্থ রয়েছে প্রায় ১১ লাখ টাকা এবং অস্থাবর সম্পদের মূল্য ৪৮ লাখ টাকা। তার বিরুদ্ধে রয়েছে ২১টি মামলা। পেশায় তিনি শিক্ষক এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা পিএইচডি। বার্ষিক আয় সাত লাখ টাকা।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক ও ঢাকা-৮ আসনে জামায়াতে ইসলামী জোটের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী পেশায় মার্কেটিং কনসালট্যান্ট। চাকরি থেকে তার আয় প্রায় আড়াই লাখ টাকা। তার হাতে নগদ রয়েছে ২৫ লাখ টাকা এবং স্ত্রীর নামে আছে ৫ লাখ টাকা। দুজনের অলঙ্কারের মূল্য ২২ লাখ টাকা। তার নামে কোনো বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট নেই। ব্যাংকে তার জমা রয়েছে মাত্র ৮ হাজার টাকা, স্ত্রীর নামে রয়েছে ছয় লাখ টাকার বেশি। সব মিলিয়ে তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪০ লাখ টাকা।
সাঈদ আল নোমান
চট্টগ্রাম-১০ আসনের এই প্রার্থী ও তার স্ত্রীর নামে রয়েছে বিপুল সম্পদ। বিএনপির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানের ছেলে সাঈদ আল নোমানের অস্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় ২৪ কোটি টাকা, আর স্ত্রীর নামে রয়েছে সাড়ে তিন কোটি টাকার সম্পদ। এছাড়া তার নামে রয়েছে ১০ কোটি ৮৩ লাখ টাকার স্থাবর সম্পদ। তিনি ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগের কথাও হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। পেশা ব্যবসা এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা এমফিল।
হুম্মাম কাদের চৌধুরী
চট্টগ্রাম-৭ আসনে বিএনপির প্রার্থী হুম্মাম কাদের চৌধুরীর তুলনায় তার স্ত্রীর সম্পদ কয়েকগুণ বেশি। হুম্মামের সম্পদের পরিমাণ ৮৪ লাখ টাকা হলেও তার স্ত্রী শ্যামানজারের সম্পদ ৪০ কোটি ৮৬ লাখ টাকার বেশি। মরহুম বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম নিজেকে তরুণ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে পরিচিত করেছেন। শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে তিনি ‘স্বশিক্ষিত’ উল্লেখ করেছেন। পেশায় তিনি ও তার স্ত্রী দুজনই ব্যবসায়ী। তার নামে কোনো মামলা বা বাড়ি নেই। একই আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী এটিএম রেজাউল করিম পেশায় চিকিৎসক এবং তার নামেও কোনো মামলা নেই।
সারজিস আলম
এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম পঞ্চগড়-১ আসন থেকে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তার মোট সম্পদের মূল্য ৩৩ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। তার নামে একটি তদন্তাধীন মামলা রয়েছে। হলফনামা অনুযায়ী, ব্যবসা থেকে তার বার্ষিক আয় ৯ লাখ টাকা। শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স)। তার নামে কোনো বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, ভবন, গাড়ি বা আগ্নেয়াস্ত্র নেই। আসবাব ও ইলেকট্রনিক সামগ্রীর মূল্য দেড় লাখ টাকা।
শাহ রিয়াজুল হান্নান
গাজীপুর-৪ আসনে বিএনপি প্রার্থী শাহ রিয়াজুল হান্নানের হলফনামা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি নিজেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি পাস দাবি করলেও এবারের নির্বাচনে নিজেকে ‘স্বশিক্ষিত’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, হলফনামায় ভুল বা গোপন তথ্য দেওয়া দণ্ডবিধির ১৮১ ও ১৯৩ ধারায় ফৌজদারি অপরাধ, যার ফলে প্রার্থিতা বাতিলসহ জেল-জরিমানার ঝুঁকি রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, ভুয়া সনদের অভিযোগের প্রেক্ষিতেই এবার তিনি নিজেকে স্বশিক্ষিত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, প্রার্থীদের দেওয়া এসব তথ্য বর্তমানে যাচাই-বাছাইয়ের আওতায় রয়েছে। কোনো প্রার্থীর তথ্যে গুরুতর অসঙ্গতি প্রমাণিত হলে তাদের প্রার্থিতা বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।







