ফেনী-৩ আসনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী আব্দুল আউয়াল মিন্টুর দ্বৈত নাগরিকত্ব প্রসঙ্গে তার মনোনয়নপত্রের বৈধতা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
গত কয়েকদিন ধরে স্থানীয়ভাবে গুঞ্জন ছিল—দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে মিন্টুর প্রার্থিতা বাতিল হতে পারে। রোববার মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের দিনে এই গুঞ্জন আরও জোরালো হয়। নির্ধারিত সময় দুপুর ১টা থাকলেও তা প্রথমে আড়াইটা এবং পরে বিকেল ৩টায় নির্ধারণ করা হলে সংশয় বাড়ে।
পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পরিত্যাগের কোনো চূড়ান্ত প্রমাণপত্র জমা না দেওয়ার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা আব্দুল আউয়াল মিন্টুর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন। এ সময় উপস্থিত বিএনপি নেতা-কর্মীরা হাততালি দিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেও অন্যদের মধ্যে বিস্ময় লক্ষ্য করা যায়।
যাচাই-বাছাই ঘোষণাকালে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মনিরা হক প্রার্থিতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন আছে কি না জানতে চাইলে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মোহাম্মদ আব্দুর রহিম মিন্টুর দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি উত্থাপন করেন। জবাবে রিটার্নিং কর্মকর্তা বলেন, মিন্টু তার হলফনামায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে নাগরিকত্ব পরিত্যাগের আবেদন জমা দেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।
মনিরা হক বলেন, প্রার্থী নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদন দাখিলের প্রমাণ দেখিয়েছেন। সংবিধানের সংশ্লিষ্ট ধারায় বলা হয়েছে—বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে তাকে দ্বৈত নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হবে না। সে বিবেচনায় মনোনয়নপত্র গ্রহণ করা হয়েছে।
মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণার পর প্রতিক্রিয়ায় আব্দুল আউয়াল মিন্টু সাংবাদিকদের বলেন, “যারা আমার কাগজপত্র যাচাই করে বৈধ ঘোষণা দিয়েছেন, তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আমার বহু ব্যাংক ঋণ ও বিভিন্ন স্থানে সম্পত্তি রয়েছে—সবকিছু যাচাই করে সঠিক পেয়েছেন। ফেনীর মানুষের কল্যাণে কাজ করারলক্ষ্যেই এই বয়সে নির্বাচন করছি।”
এদিকে যাচাই-বাছাইয়ের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ জেলায় বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই রিটার্নিং কর্মকর্তা ও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন।
মিন্টু যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগের কী ধরনের প্রমাণ দাখিল করেছেন—এমন প্রশ্নে রিটার্নিং কর্মকর্তা মনিরা হক জানান, মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে ইমেইল যোগাযোগের কপি এবং দুটি ফর্ম জমা দেওয়া হয়েছে।
এই নথি মনোনয়নপত্র বৈধতার জন্য যথেষ্ট কি না—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে পিপির পরামর্শ নেওয়া হয়েছে। আমার ভুলও হতে পারে। কেউ চাইলে আপিল করতে পারেন।”
প্রসঙ্গত, সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে বা বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য। তবে বাস্তবে অতীতে বহু দ্বৈত নাগরিক হলফনামায় নাগরিকত্ব ত্যাগের দাবি করে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন এবং সংসদ সদস্যও হয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, নাগরিকত্ব ত্যাগ কোনো মৌখিক বা তাৎক্ষণিক বিষয় নয়; এটি একটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ আইনি প্রক্রিয়া। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত অনুমোদনের পর ইস্যুকৃত Certificate of Loss of Nationality (CLN) ছাড়া নাগরিকত্ব ত্যাগের দাবি আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO), ১৯৭২ অনুযায়ী হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে প্রার্থিতা বাতিল এবং নির্বাচিত হলে সংসদ সদস্য পদ শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগও একাধিক রায়ে হলফনামাকে নির্বাচন-সংক্রান্ত মৌলিক দলিল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিশ্লেষকদের অভিমত, দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত ধোঁয়াশা দূর করতে হলে নির্বাচন কমিশনকে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস থেকে নাগরিকত্ব ত্যাগের চূড়ান্ত সনদ যাচাই করতে হবে। শুধু আবেদনপত্র বা ব্যক্তিগত ঘোষণার ওপর নির্ভর করলে সাংবিধানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে না।







