ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহিদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার তদন্ত শেষে ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। অভিযোগপত্রে হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রত্যেকের ভূমিকা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) বিকেলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম।
এর আগে মঙ্গলবার হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটি এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদন প্রকাশ করে যমুনা টেলিভিশন। সেখানে দাবি করা হয়, সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত পাঁচ দিনব্যাপী একাধিক গোপন বৈঠকে এই হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পতিত আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা ও তাদের সুসংগঠিত একটি নেটওয়ার্ক এই হত্যার পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। পরিকল্পনামূলক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা, সাবেক কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পী এবং হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ।
সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, কাউন্সিলর বাপ্পীর নির্দেশনা ও সরাসরি পরিকল্পনায় এই হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়িত হয়। শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা এবং তাকে সহযোগিতা করেন আদাবর থানা যুবলীগের কর্মী আলমগীর হোসেন শেখ। হত্যার পরপরই তারা ভারতে পালিয়ে যান।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, ফয়সালের ভগিনীপতি মুক্তি মাহমুদ এবং ফিলিপ স্নাল নামে এক দালাল তাদের দেশত্যাগে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়, শরিফ ওসমান বিন হাদি নতুন ধারার রাজনীতি শুরু করেছিলেন এবং তার বক্তৃতায় সরকার, আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে সমালোচনামূলক ও সত্যভিত্তিক বক্তব্য দিচ্ছিলেন। এসব কারণেই তাকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ডিবি জানায়, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রের ব্যালিস্টিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পজিটিভ এসেছে।
সিঙ্গাপুরে পরিকল্পনার বৈঠক
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা যায়, শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার চূড়ান্ত ছক তৈরি হয় সিঙ্গাপুরে। এ লক্ষ্যে শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ গত বছরের ২১ জুলাই সিঙ্গাপুরে যান। পরদিন ২২ জুলাই সন্ধ্যায় সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়া সীমান্তবর্তী একটি হোটেলে আওয়ামী লীগের চারজন প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে তার গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
সূত্রের দাবি, ওই পাঁচ দিনব্যাপী বৈঠকেই হত্যার রূপরেখা, অর্থের লেনদেন এবং দায়িত্ব বণ্টন নির্ধারণ করা হয়। ২৬ জুলাই দেশে ফেরার পর ফয়সালের সন্তানের নামে একটি ব্যাংকে ৫৫ লাখ টাকার ফিক্সড ডিপোজিট (এফডি) খোলার তথ্য পায় তদন্ত সংস্থা। তদন্তকারীদের মতে, এই অর্থ ছিল হত্যাকাণ্ডের পারিশ্রমিক ও পরবর্তী নিরাপত্তা ব্যয়ের অংশ।
কার কী ভূমিকা
ডিবির তথ্যমতে, এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা ছিলেন মিরপুর এলাকার সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পী। শরিফ ওসমান বিন হাদিকে গুলি করেন ফয়সাল করিম মাসুদ এবং তাকে সহযোগিতা করেন আলমগীর হোসেন।
ফয়সালের ভগিনীপতি মুক্তি মাহমুদ তাদের আশ্রয় দেন এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র সংরক্ষণ করেন। ফিলিপ স্নাল সীমান্ত পারাপারে সহায়তা করেন। এছাড়া নুরুজ্জামান ওরফে উজ্জ্বল, সিবিয়ন দিও ও সঞ্জয় চিসিম ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে আসামিদের পালাতে সহযোগিতা করেন।
অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, ফয়সালের বাবা মো. হুমায়ুন কবির মোটরসাইকেলের নম্বরপ্লেট পরিবর্তন, অস্ত্র সংরক্ষণ ও স্থানান্তরে যুক্ত ছিলেন। তার মা হাসি বেগম এবং বোন জেসমিন আক্তারও আসামিদের আশ্রয় ও অস্ত্র সংরক্ষণে ভূমিকা রাখেন।
