বাংলাদেশ পুলিশের অফিসিয়াল মাসিক প্রকাশনা ‘ডিটেকটিভ’ (The Detective) দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর ধরে ফ্যাসিস্ট শাসনামলে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক পরিবারের, বিশেষ করে শেখ মুজিবুর রহমান, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা, শেখ রাসেল ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বন্দনা ও অতিভক্তির একটি প্রাতিষ্ঠানিক মঞ্চে পরিণত হয়েছিল—এমন চিত্র উঠে এসেছে দীর্ঘ অনুসন্ধানে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ ডিটেকটিভে অতিমাত্রায় প্রশস্তিমূলক লেখা প্রকাশ করে পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার পথ সুগম করেছেন। সমালোচকদের মতে, পুলিশের অভ্যন্তরে এ ধরনের ‘তোষণ সংস্কৃতি’ ছিল দ্রুত পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়নের একটি অলিখিত কিন্তু কার্যকর পদ্ধতি, যা বাহিনীর পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও সাংবিধানিক শপথকে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
ডিটেকটিভের বিভিন্ন সংখ্যার প্রচ্ছদ, সম্পাদকীয় ও ভেতরের পাতায় নিয়মিতভাবে মুজিব পরিবারের সদস্যদের জীবন, আদর্শ ও নেতৃত্ব নিয়ে একপেশে গুণকীর্তন করা হতো। এসব লেখার প্রধান লেখক ও প্রকাশনার দায়িত্বে থাকা অধিকাংশ কর্মকর্তাই পরবর্তীতে পুলিশের সর্বোচ্চ পদসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হন। পুলিশের ভেতরে এ বন্দনার ধারা এতটাই প্রবল ছিল যে, এটি ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিদের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের একটি প্রকাশ্য মঞ্চে পরিণত হয়। বাহিনীর মধ্যে এমন রসিকতাও প্রচলিত ছিল—‘ডিটেকটিভে লেখা মানেই সিভিতে প্লাস পয়েন্ট’ এবং ‘একটি কবিতা মানে একটি পদোন্নতি’।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সুবিধাভোগী কিছু কর্মকর্তার ভাগ্য বিপর্যয়ের ঘটনাও এ তোষণভিত্তিক সংস্কৃতির ক্ষতিকর দিকটি সামনে এনেছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে, রাজনৈতিক আনুগত্য শেষ পর্যন্ত পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি।
পুলিশ সদর দপ্তরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে এখনো ‘Detective Magazine’-কে পুলিশের অফিসিয়াল প্রকাশনা হিসেবে উল্লেখ করা আছে। শুরুতে এটি আইনশৃঙ্খলা, অপরাধ বিশ্লেষণ, তদন্ত কৌশল ও সাহিত্যভিত্তিক একটি পেশাদার প্রকাশনা ছিল। তবে কনটেন্ট বিশ্লেষণে দেখা যায়, একপর্যায়ে এটি পেশাগত গবেষণার জায়গা ছেড়ে রাজনৈতিক বন্দনার মাধ্যমে পরিণত হয় এক ধরনের প্রচারপত্রে।
২০১০ সালের পর থেকে প্রতিটি সংখ্যায় মুজিব পরিবারকেন্দ্রিক থিম নির্ধারণ করা হতো। সম্পাদকীয় পর্যায় থেকেই বিষয় নির্দেশনা দেওয়া হতো, যাতে মূল লেখাগুলো ওই পরিবারকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি সংখ্যায় শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা বা শেখ রাসেলকে নিয়ে লেখা প্রকাশিত হয়েছে—কখনো গদ্যে, কখনো কবিতায়। ভাষা ছিল অতিমাত্রায় প্রশস্তিমূলক, যা অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পোস্টারের ভাষার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
ডিটেকটিভে প্রকাশিত বহু কবিতা ও প্রবন্ধে মুজিব পরিবারকে পৌরাণিক ও অপ্রতিরোধ্য মাত্রায় উপস্থাপন করা হয়েছে। ২০১৫ সালের আগস্ট সংখ্যায় এক লেখায় বলা হয়, ‘মুজিবের আদর্শ ছাড়া বাংলাদেশ কল্পনাই করা যায় না। আমরা তার সৈনিক, তার কথাই আমাদের শপথ।’ অন্য লেখায় শেখ হাসিনাকে ‘সমগ্র বিশ্বের মানবতার আলোকবর্তিকা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
২০২১ সালের আগস্ট সংখ্যায় তৎকালীন স্পেশাল ব্রাঞ্চের কর্মকর্তা শামিমা বেগম তার কবিতায় বঙ্গবন্ধুকে ‘অবিনশ্বর’, ‘ধ্রুবতারা’ ও ‘বিশ্বমানবের জ্যোতি’ হিসেবে তুলে ধরেন। পুলিশ সুপার দেওয়ান লালন আহমেদ, আলেপ মাহমুদসহ আরও অনেক কর্মকর্তা কবিতা ও প্রবন্ধে শেখ মুজিবকে চিরন্তন ও অমর সত্তা হিসেবে বর্ণনা করেন। একইভাবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে ‘বঙ্গবন্ধুর মহাকাব্যের পরিণতি’ ও ‘বিশ্বের রোল মডেল’ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
সংবিধানের ১৪৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক হলেও সরকারি বাহিনীর অফিসিয়াল প্রকাশনায় এ ধরনের ভাষা সেই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ প্রবণতা শুধু প্রকাশনাকে নয়, পুলিশের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের চারজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, পুলিশের মুখপত্রে যদি নিরপেক্ষ আলোচনার পরিবর্তে তোষণ প্রাধান্য পায়, তাহলে বাহিনী রাষ্ট্রের নয়, সরকারের বাহিনীতে পরিণত হয়। ২০১৫ সালের পর ডিটেকটিভে অপরাধ বিশ্লেষণ, ফরেনসিক বা তদন্ত তত্ত্বের মতো পেশাগত লেখা কার্যত বিলীন হয়ে যায়। জায়গা নেয় কবিতা, স্মৃতিকথা ও আবেগঘন প্রশস্তি।
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা জানান, অনেক সময় বঙ্গবন্ধু বা শেখ হাসিনাকে নিয়ে লেখার জন্য অনানুষ্ঠানিক চাপ দেওয়া হতো। যারা লিখতেন না, তাদের পদোন্নতিতে নীরব বাধা সৃষ্টি হতো। বিপরীতে, প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা দ্রুত উচ্চপদে উন্নীত হন।
ডিটেকটিভের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বেনজীর আহমেদ এবং বর্তমানে কারাবন্দি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন পরবর্তীতে আইজিপি ও সিনিয়র সচিব পদমর্যাদা লাভ করেন। প্রকাশনার সম্পাদক হাবিবুর রহমান অতিরিক্ত আইজিপি ও ডিএমপি কমিশনার হন। প্রধান সম্পাদক কামরুল আহসান গ্রেড-১ পদে উন্নীত হন। মুজিব বন্দনামূলক কবিতায় অগ্রণী ভূমিকা রাখা শামিমা বেগম ডিআইজি পদে পদোন্নতি পান।
অবসরপ্রাপ্ত এক ডিআইজি বলেন, ডিটেকটিভ একসময় পেশাগত চেতনার প্রতীক হলেও পরে তা হয়ে ওঠে বন্দনা ও পদোন্নতির লেনদেনের প্ল্যাটফর্ম। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর অনেক সুবিধাভোগী কর্মকর্তা অবনমন, আইনি জটিলতা ও বিচার প্রক্রিয়ার মুখে পড়েন।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, ডিটেকটিভ স্পষ্টভাবে দেখায় যে বিশেষ পরিবারের প্রতি আনুগত্যই ছিল পদোন্নতির অলিখিত মাপকাঠি। নতুন সরকারের অধীনে প্রশ্ন উঠেছে—এই বন্দনাভিত্তিক সুবিধাভোগীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, পুলিশ পেশাদার ও নিরপেক্ষ বাহিনী হিসেবে কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। বাহিনীর প্রকাশনা ও যোগাযোগ কার্যক্রম থেকে রাজনৈতিক পক্ষপাত দূর করতে নীতিমালা হালনাগাদ, সম্পাদকীয় সতর্কতা বৃদ্ধি এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।







