ইরানে গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দেশটির শাসক ধর্মীয় নেতৃত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জে রূপ নিয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ক্ষমতায় থাকা এই শাসকগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, চলমান বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর শতাধিক সদস্য নিহত হয়েছেন। তবে সরকারবিরোধী সূত্রগুলোর দাবি, নিহতের সংখ্যা আরও বেশি এবং এর মধ্যে কয়েক ডজন বিক্ষোভকারীও রয়েছেন। আল-জাজিরা কোনো পক্ষের দেওয়া তথ্যই স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
ইরানের এই বিক্ষোভ পরিস্থিতি সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে তুরস্ক। আঙ্কারার আশঙ্কা, সহিংসতা বাড়লে তা পুরো অঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী তুরস্ক ও ইরান সিরিয়া, ইরাক ও লেবাননসহ নানা ইস্যুতে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে রয়েছে।
তুরস্কের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে, ইরান সরকারের বিরুদ্ধে সহিংস অভ্যুত্থান ঘটলে প্রায় ৯ কোটির জনসংখ্যার দেশটি ভেঙে পড়তে পারে। বহু জাতিগোষ্ঠী ও ভিন্ন মতাদর্শে গঠিত ইরানে এমন পরিস্থিতি ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আঙ্কারাভিত্তিক সেন্টার ফর ইরানিয়ান স্টাডিজের চেয়ারম্যান সেরহান আফাকান বলেন, বিক্ষোভকারীদের অর্থনৈতিক দাবিদাওয়া তুরস্ক বৈধ ও ন্যায্য বলে মনে করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিক্ষোভে মসজিদে হামলার মতো উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড বাড়ছে বলেও আঙ্কারার ধারণা। তিনি বলেন, তুরস্ক এমন কোনো অবস্থান নিতে পারে না, যা তেহরান ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সরকার পতনের আহ্বানের সঙ্গে একাত্মতা হিসেবে দেখবে।
ইরান ও অঞ্চলবিষয়ক বিশ্লেষক এবং থিংক ট্যাংক সেটার সঙ্গে যুক্ত মুস্তাফা কানের বলেন, ইরান–তুরস্ক সম্পর্কের ভেতরে প্রতিযোগিতা থাকলেও ইরানের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করা তুরস্কের জন্য অগ্রাধিকার।
এই অবস্থান প্রতিফলিত হয়েছে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সাম্প্রতিক টেলিভিশন ভাষণে। তিনি বলেন, চলমান বিক্ষোভের কারণে ইরানি সরকারের পতন ঘটবে বলে আঙ্কারা মনে করে না। ফিদানের মতে, এই আন্দোলন ২০২২ সালের বিক্ষোভের তুলনায় আকারে ছোট হলেও ইরানের অনেক বিশ্লেষক একে অন্তত ১৯৯৯ সালের পর সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ হিসেবে দেখছেন।
ফিদান বলেন, গত ৩০ বছরে ইরান তার উচ্চাকাঙ্ক্ষী আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নীতির কারণে কঠোর পশ্চিমা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে। দেশটির তরুণ, আধুনিক ও প্রাণবন্ত জনগোষ্ঠী প্রতিদিনের জীবনযাপন ও অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিক্ষোভকে শাসকগোষ্ঠীর জন্য ‘খুব শক্ত বার্তা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে ফিদান বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন সরকার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নেবে। তবে এই আন্দোলনের মাধ্যমে ইসরাইল যে লক্ষ্য—ইরানি সরকারের পতন—চায়, তা বাস্তবায়িত হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ফিদান আরও বলেন, বিদেশ থেকে ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বীরা এই বিক্ষোভকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। তার ভাষায়, মোসাদ প্রকাশ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে ইরানি জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে উসকানি দিচ্ছে।
তুরস্কের দৃষ্টিতে, ইরান সরকারের সামনে এগোনোর পথ হলো পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করা। ফিদান বলেন, তুরস্ক এমন একটি চুক্তিকে সমর্থন করে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রধান পক্ষগুলো যুক্ত থাকবে এবং যা উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক হবে। তার মতে, এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা সেই সমঝোতার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করছে।
