ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক কার্যালয় (এসইএআরও)-এর আঞ্চলিক পরিচালক পদে পুনর্বহালের জন্য জোরালো লবিং চালাচ্ছে বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। বিতর্ক ও গুরুতর অভিযোগের মুখে দীর্ঘমেয়াদি ছুটিতে পাঠানো পুতুলকে আবারও ওই পদে বসাতে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একাধিক লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সূত্রগুলো জানায়, পুতুলকে ছুটি শেষে পুনরায় দায়িত্বে ফিরিয়ে আনতে লবিস্ট ফার্মগুলো ইতোমধ্যে ডব্লিউএইচওতে একাধিক আবেদন জমা দিয়েছে। বিষয়টি আমলে নিয়ে সংস্থাটি বাংলাদেশের সরকারের মতামত জানতে চেয়েছে। আইন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমার দেশ-কে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
কর্মকর্তারা জানান, ডব্লিউএইচওর চিঠির দ্রুত জবাব দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। জবাবপত্রের সঙ্গে পুতুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলায় আদালতের রায়ের কপি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও দপ্তরের প্রতিবেদন সংযুক্ত করা হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বিতর্কিত ও দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত একজন পলাতক ব্যক্তি যদি পুনরায় ওই গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরতে পারেন, তবে তা বাংলাদেশ ও ডব্লিউএইচও—উভয়ের জন্যই চরম অবমাননাকর হবে।
এ বিষয়ে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল আমার দেশ-কে বলেন, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল বাংলাদেশের আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত। একজন দণ্ডিত আসামিকে আন্তর্জাতিক সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হলে তা নেতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুনাম ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ করবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি বলেন, বাংলাদেশ ও ডব্লিউএইচওর মর্যাদা রক্ষায় সরকার সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে। অতীতে যে ভুলের কারণে সায়মা ওয়াজেদের মতো একজন বিতর্কিত ব্যক্তি এমন পদে বসতে পেরেছিলেন, তার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে সে বিষয়ে সরকার দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে।
ডব্লিউএইচওর চিঠি ও বাংলাদেশের অবস্থান
আইন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ডব্লিউএইচওর সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও দীর্ঘদিনের কার্যকর সহযোগিতা রয়েছে। ২০২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ভারতের নয়াদিল্লিতে অবস্থিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক কার্যালয়ের আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন পুতুল। তবে শুরু থেকেই তার নিয়োগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি ভারতে পালিয়ে যান। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের আপত্তি এবং পুতুলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও অনিয়মের বিশ্বাসযোগ্য তথ্যপ্রমাণ ডব্লিউএইচওর সদর দপ্তরে পাঠানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১১ জুলাই থেকে তাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটিতে পাঠায় সংস্থাটি।
আইন মন্ত্রণালয়ের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, পুতুলকে পুনর্বহালের বিষয়ে মতামত জানতে চেয়ে ডব্লিউএইচওর চিঠি আসার পর অনুসন্ধানে জানা গেছে—কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের দুটি লবিস্ট ফার্মকে এই কাজে নিয়োজিত করেছে।
দুর্নীতি, সাজা ও নিয়োগ বিতর্ক
সাম্প্রতিক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডব্লিউএইচওকে পাঠানো চিঠিতে পুতুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের রায়ের কপি সংযুক্ত করা হয়েছে। রাজউকের পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে তথ্য গোপন ও মিথ্যা হলফনামা দিয়ে প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় গত ২৭ নভেম্বর তাকে এই সাজা দেন আদালত।
এ ছাড়া দুদকের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, পুতুলের নিয়োগে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে এবং শেখ হাসিনা তার মেয়েকে পদায়নে নিয়মবহির্ভূত হস্তক্ষেপ করেছেন। চিঠিতে সূচনা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থ লোপাট, এমনকি কানাডার নাগরিকত্বের তথ্য গোপনের অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে।
আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, সরকার ইতোমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে এসব তথ্য অবহিত করেছে। নৈতিক স্খলনের দায়ে দণ্ডিত কোনো ব্যক্তি যেন ডব্লিউএইচওর মতো স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হতে না পারেন—এটাই বাংলাদেশের প্রত্যাশা।







