ইরানের চলমান বিক্ষোভে অংশ নিয়ে নিহত হয়েছেন তেহরানের বাসিন্দা সিভাস শিরজাদ (৩৮)। গত ৮ জানুয়ারি তেহরানে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে তিনি নিহত হন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যে আশ্বস্ত হয়েই তিনি বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন। নিহত শিরজাদের ১২ বছর বয়সী সন্তান এখনো বাবার ফেরার অপেক্ষায় রয়েছে।
এক আত্মীয় জানান, বিক্ষোভে না যেতে পরিবার থেকে শিরজাদকে সতর্ক করা হয়েছিল। সম্ভাব্য ঝুঁকির কথাও বলা হয়। তবে তিনি তা উপেক্ষা করে বলেন, ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে উদ্ধার অভিযানে যাবে। এরপরই তিনি রাস্তায় নামেন। পরে গুলিবর্ষণ শুরু হলে আর কেউ উদ্ধার করতে আসেনি।
১৩ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বার্তা দিয়ে লেখেন, ‘আন্দোলন চালিয়ে যান। সাহায্য যাচ্ছে।’ এই বার্তায় বিক্ষোভকারীদের মধ্যে নতুন করে আশা জাগে। তবে একদিন পরই ট্রাম্প নরম সুরে কথা বলেন এবং জানান, তেহরানের শাসকদের কাছ থেকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার আশ্বাস পেয়েছেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনও সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ থেকে সরে আসে।
এরপর থেকেই আন্দোলনে ভাটা পড়ে। ট্রাম্প হত্যাকাণ্ড বন্ধের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তা থামেনি বলে অভিযোগ ওঠে। তেহরানের রাজপথ ধীরে ধীরে ফাঁকা হতে শুরু করে। অন্যান্য শহরে বিচ্ছিন্ন বিক্ষোভ হলেও ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় সেসবের বিস্তার সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
এক মানবাধিকারকর্মীর মাধ্যমে দ্য গার্ডিয়ানে পাঠানো বার্তায় তেহরানের এক বাসিন্দা জানান, বর্তমানে দেশজুড়ে গণগ্রেপ্তার অভিযান চলছে। ট্রাম্পের মনোযোগ অন্যদিকে সরে যেতেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
২৬ বছর বয়সী এরফান সোলতানির মৃত্যুদণ্ড স্থগিতের ঘটনায় তেহরানের কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড না দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই এই খবর সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করেন। তবে বিদেশে অবস্থানরত বহু ইরানি বিক্ষোভকারী নিজেদের প্রতারিত মনে করছেন।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বসবাসরত ইরানি নাগরিক এলহাম বলেন, ইরানিরা আগেও হতাশ হয়েছে, তবে এবার মনে হয়েছিল পরিস্থিতি বদলাতে পারে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সেই আশা ভেঙে গেছে। অনেক প্রবাসী ইরানির মতে, ট্রাম্পের অবস্থান পরিবর্তনের ফলে শাসকদেরই বিজয় হয়েছে।
গত বুধবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রকে কূটনৈতিক পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানান। এই বক্তব্য বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দেয়।
ইরানের একজন বিশ্লেষক মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হস্তক্ষেপ করলে তা বিক্ষোভকারীদের জন্য উল্টো ঝুঁকি তৈরি করত। এতে শাসকগোষ্ঠী বিদেশি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে আন্দোলনকারীদের দমন আরও জোরদার করতে পারত।
তবে এখনও কেউ কেউ আশা করছেন, একদিন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইরানের জনগণের পাশে দাঁড়াবে। কানাডায় বসবাসকারী আজম জাংরাবি জানান, তাঁর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু সম্প্রতি ইসফাহানে বিক্ষোভে অংশ নিয়ে নিহত হয়েছেন। তার মতে, ইরানের মানুষ ট্রাম্পের কথায় বিশ্বাস করেছিল। শেষ পর্যন্ত যদি তিনি পদক্ষেপ না নেন, সেই বিশ্বাস চিরতরে ভেঙে যাবে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি সামরিক বিকল্প থেকে সরে আসেনি বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন দেশটির প্রতিনিধি মাইক ওয়াল্টজ। তিনি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বলেছেন, ট্রাম্প সব ধরনের বিকল্প খোলা রেখেছেন। সম্প্রতি একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাত্রা শুরু করেছে এবং ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদারে সামরিক পুনর্বিন্যাস দেখা গেছে।
তবুও ইরানের আন্দোলনকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও হতাশা বাড়ছে। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় দেশটি কার্যত বিশ্বের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন। ফের রাজপথে নামা নিয়ে দ্বিধায় রয়েছেন অনেকে। তেহরানের বাসিন্দা আলবোরজ দ্য গার্ডিয়ানে পাঠানো বার্তায় জানান, বিক্ষোভ কার্যত থেমে গেছে। এখন মানুষ শুধু অপেক্ষা করছে—ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেন।







