জুলাই বিপ্লবে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ভারতের বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতা থেমে নেই। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সেই তৎপরতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। নির্বাচনের আর মাত্র তিন সপ্তাহ বাকি থাকতেই দিল্লিতে শুরু হয়েছে নতুন ষড়যন্ত্র।
বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করা এবং দেশটিকে ‘মৌলবাদী’ রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করে আন্তর্জাতিকভাবে চাপে ফেলাই এখন দিল্লির নীতিনির্ধারকদের মূল লক্ষ্য বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এ লক্ষ্যে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে পুনরায় রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় করার পাশাপাশি দিল্লিভিত্তিক একাধিক থিংক ট্যাংক ও প্রভাবশালী মহল বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণায় মাঠে নেমেছে।
গত কয়েক দিনে দিল্লিতে আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলন, বাংলাদেশে কর্মরত ভারতীয় কূটনীতিকদের পরিবার-পরিজন ফিরিয়ে নেওয়া, বাংলাদেশে কথিত ইসলামি মৌলবাদের উত্থান নিয়ে সেমিনারের আয়োজন এবং সর্বশেষ দিল্লিতে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের মতবিনিময় কর্মসূচি—সব মিলিয়ে ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশবিরোধী কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
ঢাকা ও দিল্লির একাধিক কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ নিয়ে দিল্লিতে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে, যা সামনে আরও বাড়তে পারে। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের কোনো নির্বাচন মেনে নিতে পারছে না মোদি সরকারের নীতিনির্ধারকরা। বিএনপির ওপর আস্থার ঘাটতি এবং ইসলামি দলগুলোর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি দিল্লিকে বাড়তি উদ্বেগে ফেলেছে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দিল্লির মূল লক্ষ্য এখন বাংলাদেশকে মৌলবাদী তকমা দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে কোণঠাসা করা এবং দেশটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল সময় অতিক্রম করছে। এই সময়ে দিল্লির প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য তৎপরতা গভীর উদ্বেগের কারণ। গত ১৭ জানুয়ারি দিল্লি প্রেস ক্লাবে আওয়ামী লীগ নেতাদের সংবাদ সম্মেলন ছিল এই তৎপরতারই অংশ। সেখানে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল দাবি করেন, আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন হলে বাংলাদেশ অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হলেও ওই ঘটনায় কোনো গুরুত্ব দেয়নি ভারত সরকার। এর পরপরই ২০ জানুয়ারি দিল্লির ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে বাংলাদেশে কথিত মৌলবাদের উত্থান নিয়ে একটি বইয়ের আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বাংলাদেশকে ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
এদিকে ভারতীয় কূটনৈতিক ও গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার দিল্লিতে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো ক্যামেরার সামনে আসতে পারেন শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানের আয়োজক হিসেবে রয়েছে ফরেন করেসপনডেন্স ক্লাব অব সাউথ এশিয়া ও ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব প্রেস ক্লাব। আমন্ত্রণপত্রে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে ঢাকা।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আয়োজন স্পষ্টভাবে উসকানিমূলক। মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশের বারবার দাবির পরও দিল্লির এমন অবস্থান বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেওয়ার বার্তা দেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে দিল্লির এই তৎপরতা অপ্রত্যাশিত নয়। ভারত দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ নিয়ে এমন অপতৎপরতা চালিয়ে আসছে। কূটনীতিকদের পরিবার প্রত্যাহারের ঘটনাও বড় ধরনের বার্তা বহন করে।
অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে ইউনূস সরকারকে চাপে ফেলতেই দিল্লি নতুন করে বাংলাদেশকে মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করছে। ইসলামি দলগুলোর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিই এই উদ্বেগের মূল কারণ।
তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো—বাংলাদেশবিরোধী এই তৎপরতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পরিসরে জোরালো প্রতিবাদ খুব কমই দেখা যাচ্ছে।







