বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘোষিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি নিয়ে অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচনী সভাগুলোতে তিনি ৪ কোটি পরিবারের নারীদের জন্য মাসিক ২ হাজার টাকা, কখনো ২ হাজার ৫০০ টাকা সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। অর্থনীতিবিদদের হিসাব অনুযায়ী, মাসে ২ হাজার টাকা করে ৪ কোটি পরিবারকে সহায়তা দিতে হলে প্রতি মাসে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা এবং বছরে প্রায় ৯৬ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ কোটি টাকার সংস্থান প্রয়োজন হবে।
এত বিপুল অর্থের উৎস কী হবে—সে বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট ও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা আসেনি। দলটির নেতারা দাবি করছেন, দেশে প্রতিবছর দুর্নীতি ও অর্থপাচারের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ নষ্ট হয়; ক্ষমতায় এলে সেই অপচয় বন্ধ করে সাশ্রয়কৃত অর্থ দিয়েই এই প্রকল্প চালানো হবে। তবে নিরপেক্ষ বিশ্লেষকদের মতে, দুর্নীতির অর্থ উদ্ধার করে নিয়মিত ও দীর্ঘমেয়াদি একটি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি পরিচালনা করা বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন। এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী কর কাঠামো, রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীল খাতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি—যার কোনো স্পষ্ট রূপরেখা এখনো উপস্থাপন করা হয়নি।
অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন, এ ধরনের কর্মসূচি চালু হলে কয়েকটি বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। প্রথমত, উৎপাদন না বাড়িয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ বাজারে প্রবাহিত হলে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে, ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা জোগান দিতে গিয়ে সরকার যদি ব্যাংকঋণ নেয় বা নতুন টাকা ছাপে, তাহলে রাজকোষ ঘাটতি বাড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনীতি চাপের মুখে পড়বে। এতে উন্নয়ন বাজেট—যেমন সড়ক, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে ব্যয়—সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এ ছাড়া বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ৪ কোটি পরিবারের সঠিক ও হালনাগাদ ডেটাবেজ তৈরি করা, রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বজনপ্রীতি এড়িয়ে প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে কার্ড পৌঁছানো বাংলাদেশের বিদ্যমান আমলাতান্ত্রিক কাঠামোতে কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে, ঘোষণাটি সবার জন্য হলেও বাস্তবে সুবিধা পেতে পারে সীমিত একটি গোষ্ঠী, কিংবা সুবিধা পেতেও অনিয়ম, ঘুষ বা রাজনৈতিক আনুগত্যের চাপ তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে আলোচনায় এলেও এর অর্থনৈতিক টেকসইতা, অর্থের উৎস এবং বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়ে স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা না থাকায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক ক্রমেই বাড়ছে।







