আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-১২ আসনে সৃষ্টি হয়েছে ভিন্নমাত্রার রাজনৈতিক উত্তাপ ও কৌতূহল। এই আসনের নির্বাচনী লড়াইয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন তিনজন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী—যাদের নাম কাকতালীয়ভাবে এক, সাইফুল। দলীয় রাজনীতি, বিদ্রোহী অবস্থান ও আদর্শিক সংগ্রামের এই ত্রিমুখী লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কে বিজয়ী হবেন, তা নিয়ে ভোটারদের মধ্যে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ।
তেজগাঁও, শিল্পাঞ্চল, হাতিরঝিল, শেরে বাংলানগর ও রমনা থানার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত ঢাকা-১২ আসন রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী এলাকা। দেশের ব্যবসায়িক কেন্দ্র কারওয়ান বাজার, জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ও এই আসনের অন্তর্ভুক্ত। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ২৮ হাজার ৮৩০।
একক আসন হিসেবে এখানে মোট ১৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও মূল লড়াই সীমাবদ্ধ থাকছে তিন সাইফুলের মধ্যেই। তারা হলেন—বিএনপি-জোট সমর্থিত বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা বিএনপির বিদ্রোহী নেতা সাইফুল আলম নীরব। তিনজনই নিজ নিজ রাজনৈতিক অবস্থান, অভিজ্ঞতা ও প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন।
জামায়াত প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন
দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন দীর্ঘ ছাত্ররাজনীতি ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা নিয়ে মাঠে নেমেছেন। ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মিলন তার নির্বাচনী অঙ্গীকারে চাঁদাবাজি ও মাদক নির্মূল, গ্যাস-পানি ও ড্রেনেজ সমস্যার সমাধান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ এবং হাতিরঝিল এলাকার পরিবেশ ও নিরাপত্তা উন্নয়নের কথা তুলে ধরছেন।
তিনি বলেন, সাধারণ ভোটার, শিক্ষার্থী ও তরুণদের কাছে তিনি গ্রহণযোগ্য প্রার্থী। একই সঙ্গে তিনি নির্বাচনী শিষ্টাচার বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে যেন কোনো ধরনের সহিংসতা বা অস্থিরতা না ঘটে—সে বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।
বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী সাইফুল হক
‘কোদাল’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে থাকা বিএনপি-সমর্থিত বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক দীর্ঘ আদর্শিক রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ভোটারদের সমর্থন চাইছেন। তিনি বলেন, ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত প্রতিটি আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।
তার নির্বাচনী ইশতেহারে রয়েছে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নির্মূল, গ্যাস-পানি ও জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধান, হাতিরঝিলের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য-শিক্ষা খাতের সম্প্রসারণ এবং কিশোর গ্যাং দমনের প্রতিশ্রুতি। তিনি দাবি করেন, দলীয় সমর্থন ও দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের কারণে তিনি বড় ব্যবধানে জয়ী হবেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল আলম নীরব
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক ও যুবদলের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম নীরব এই আসনের আরেক আলোচিত মুখ। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে তিনি ‘ফুটবল’ প্রতীক নিয়ে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।
নিজেকে এলাকার সন্তান দাবি করে নীরব বলেন, দীর্ঘ ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি এই এলাকায় রাজনীতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত। তার প্রধান লক্ষ্য ঢাকা-১২ আসনকে মাদক, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংমুক্ত করা। স্থানীয় উপস্থিতি ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপরই তিনি ভরসা রাখছেন।
সব মিলিয়ে ঢাকা-১২ আসনের নির্বাচন এবার কেবল দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং আদর্শিক রাজনীতি, সংগঠনের শক্তি ও স্বতন্ত্র অবস্থানের এক বহুমাত্রিক লড়াইয়ের রূপ নিয়েছে এই আসন। তিন সাইফুলের এই ভোটযুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কোন সাইফুল জয়ী হন—সেই অপেক্ষায় এখন ভোটার ও রাজনৈতিক মহল।
