গণভোট সংক্রান্ত কোনো ধরনের প্রচারণায় যুক্ত না হতে রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’—কোনো পক্ষের পক্ষেই প্রচারে জড়িত না হওয়ার বিষয়ে কড়া সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়ার কথাও ভাবছে কমিশন।
ইসি সূত্র জানায়, নির্বাচনকে নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য রাখতে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচন চলমান থাকা অবস্থায় আচরণবিধি সংশোধনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। তফসিল ঘোষণার দেড় মাস পর আচরণবিধি পরিবর্তনের এই উদ্যোগ কমিশনের প্রস্তুতি ও নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কমিশন সূত্র আরও জানায়, কোনো নির্বাচনি কর্মকর্তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গণভোটের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রচারে যুক্ত হলে তা আচরণবিধি লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। এমন কর্মকাণ্ড নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ণ করার পাশাপাশি কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
এ বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার আমার দেশকে বলেন, নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা রিটার্নিং কর্মকর্তা, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং ভোট গ্রহণ কর্মকর্তারা—প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসার—কেউই গণভোটসংক্রান্ত কোনো প্রচারে যুক্ত হতে পারবেন না। এতে নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হতে পারে। প্রয়োজন হলে সরকারকেও বিষয়টি অবহিত করা হবে।
ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাসউদ আমার দেশকে বলেন, আমরা প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা হিসেবে নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত। শুরুতে গণভোট ইস্যুতে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে কিছু তৎপরতা থাকলেও ইসি থেকে নির্দেশনা পাওয়ার পর সে ধরনের কোনো কর্মকাণ্ডে আর যুক্ত নই।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, তিনি গণভোটের পক্ষে কোনো প্রচারে যুক্ত নন। তার মূল লক্ষ্য একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আবদুল আলীম আমার দেশকে বলেন, নির্বাচন কমিশন যদি এ ধরনের নির্দেশনা দিয়ে থাকে, তা নিঃসন্দেহে সঠিক সিদ্ধান্ত। নির্বাচনি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কোনো পক্ষের হয়ে ভোট চাওয়ার সুযোগ নেই। সরকার চাইলে নিজ অবস্থান থেকে প্রচার চালাতে পারে; কিন্তু নির্বাচন পরিচালনাকারীরা করলে নিরপেক্ষতা নষ্ট হয়। নৈতিকভাবেও তা গ্রহণযোগ্য নয়।
এদিকে আচরণবিধির কয়েকটি ধারা নিয়ে মাঠ পর্যায়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়ায় সেগুলো সংশোধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। সংশোধনী অনুযায়ী রাজনৈতিক জনসভায় সর্বোচ্চ তিনটি মাইক ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা তুলে নেওয়া হচ্ছে। দলীয় প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক মাইক ও শব্দযন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ থাকছে।
এ ছাড়া ভোটার স্লিপে আগে শুধু ভোটকেন্দ্র ও ভোটারসংক্রান্ত তথ্য থাকলেও নতুন সংশোধনীতে প্রার্থীরা নিজেদের নাম, দলীয় পরিচয় ও প্রতীক সংবলিত ভোটার স্লিপ সরবরাহ করতে পারবেন।
নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ আমার দেশকে বলেন, জনসভায় মাইক ব্যবহারের বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভোটার স্লিপ সংক্রান্ত বিধানেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নির্বাচন কমিশনার বলেন, ভোটার স্লিপ সরবরাহে প্রার্থীর কোনো বাস্তব সুবিধা না থাকলে তিনি কেন তা দেবেন—এই বিবেচনা থেকেই সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে নির্বাচনের মাঝপথে আচরণবিধি সংশোধনের বিষয়টি স্বাভাবিক চর্চা নয় বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, এতে মাঠ পর্যায়ে বিভ্রান্তি বাড়ে এবং কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এ ধরনের সিদ্ধান্তের আগে রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে ব্যাপক আলোচনা প্রয়োজন ছিল।
