জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রশিক্ষণসহ পুলিশের দাপ্তরিক প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন হলেও মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনে তাদের মনোবল বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশের ভেঙে পড়া মনোবল এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি—পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যানেই সেই চিত্র স্পষ্ট।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরে সারা দেশে পুলিশের ওপর হামলা ও হেনস্তার ঘটনায় অন্তত ৬০১টি মামলা হয়েছে। জানুয়ারিতে ৩৮টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩৭টি, মার্চে ৯৬টি, এপ্রিলে ৫২টি, মে মাসে ৬২টি, জুনে ৪৪টি, জুলাইয়ে ৩৯টি, আগস্টে ৫১টি, সেপ্টেম্বরে ৪৩টি, অক্টোবরে ৬৯টি, নভেম্বরে ৪১টি এবং নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার মাস ডিসেম্বরে ২৯টি মামলা রেকর্ড করা হয়। একই সময়ে শুধু ঢাকাতেই পুলিশের ওপর হামলার মামলা হয়েছে ৮৯টি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকৃত ঘটনা এর চেয়েও বেশি; অনেক ‘ছোটখাটো’ হামলার ঘটনা মামলা পর্যন্ত গড়ায় না।
যেখানে পুলিশের দায়িত্ব অপরাধ দমন ও সহিংসতা ঠেকানো, সেখানে উল্টো পুলিশই আক্রান্ত হলে পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা। পুলিশের ওপর হামলা, প্রকাশ্যে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও অপমানের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও বিচার বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দৃশ্যমান উদ্যোগ খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। এতে পুলিশের ভেতরে হতাশা ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বাড়ছে।
সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, পুলিশের মনোবল দুর্বল হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে। পুলিশ যদি টহল বা তল্লাশি কার্যক্রমে অনিচ্ছুক হয়ে পড়ে, তখন অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
রাজধানী থেকে শুরু করে বিভাগীয় শহর, জেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চল—সবখানেই পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা বাড়ছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা জানান, আগে অপরাধীরা পুলিশ দেখলে পালানোর চেষ্টা করত; এখন অনেক ক্ষেত্রেই সংঘবদ্ধভাবে পুলিশের মুখোমুখি হচ্ছে। কোথাও আসামি ধরতে গেলে স্থানীয় লোকজন জড়ো হয়ে বাধা দিচ্ছে, কোথাও মুহূর্তেই তৈরি হচ্ছে ‘মব’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে পুলিশকে পিছু হটতে বাধ্য করার ঘটনাও বাড়ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের কাছ থেকে শটগান, ওয়াকিটকি ছিনিয়ে নেওয়া কিংবা গ্রেপ্তার করা আসামিকে হাতকড়াসহ ছিনিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনা শুধু পুলিশের নয়, রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের সক্ষমতাকেই সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে।
গত কয়েক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটেছে। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে চেকপোস্টে তল্লাশির সময় এক পুলিশ সদস্য কুপিয়ে আহত হন। বগুড়ার ধুনটে মব সৃষ্টি করে দুই পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা চালানো হয়। সীতাকুণ্ডে সন্ত্রাসীদের গুলিতে এক র্যাব সদস্য নিহত হন। ময়মনসিংহ, সুনামগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারেও পুলিশের ওপর হামলার একাধিক ঘটনা ঘটেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অনেক পুলিশ সদস্য এখন ইউনিফর্ম পরে দায়িত্ব পালনে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন না। ডিএমপির এক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। কোথাও গেলে স্থানীয় লোকজন ঘিরে ধরলে নিজের নিরাপত্তার কথাই আগে ভাবতে হয়। অনেক সময় ঘটনা রিপোর্ট করলেও উল্টো প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়।’
পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ‘মব কালচার’ বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। গুজব বা তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুহূর্তেই জনতা সংঘবদ্ধ হয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব। অনেক অভিযুক্ত সহজেই জামিনে বেরিয়ে আসায় দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে, যা পুলিশ সদস্যদের মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে তুলছে।
রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের এক কনস্টেবল বলেন, ‘আমরাও মানুষ, আমাদেরও পরিবার আছে। ডিউটিতে বের হয়ে নিরাপদে ফিরতে পারব কি না—এই দুশ্চিন্তা সারাক্ষণ তাড়া করে।’
বিশ্লেষকদের মতে, নিয়মিত ঝুঁকির মুখে থেকেও যদি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না থাকে, তাহলে মনোবল ভেঙে পড়া স্বাভাবিক। পুলিশকে কোণঠাসা করলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো সমাজ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানেই নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এই বাস্তবতা এখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। বরং বেআইনি আবদারে সাড়া না দিলে পুলিশকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটছে। দ্রুত হামলাকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় না আনলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা ও হেনস্তার ঘটনা নিন্দনীয়। এসব ঘটনার তদন্ত চলছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।







