জনাব তারেক রহমানের বাংলাদেশে আগমন নিঃসন্দেহে জুলাই বিপ্লবের ফলশ্রুতি, এবং গণতান্ত্রিক যাত্রার এক ঐতিহাসিক সোপান। তাকে চিত্রায়িত করা হয়েছে, এই বাংলার “লুথার কিং” এবং “আগামীর প্রধানমন্ত্রী” হিসেবে। জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশের কাণ্ডারী হয়ে দেশকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবেন, এটাই এখন সবার প্রত্যাশা।
কিন্তু, বাংলাদেশ এখন আর আগের অবস্থানে নেই। জুলাই বিপ্লব নিত্যনতুন প্রত্যাশা জাগিয়ে তুলেছে জনমনে। “মুক্তিযোদ্ধা বনাম রাজাকার” এই বয়ান এখন অচল, এবং কাউন্টার প্রোডাক্টিভ। দেশের মানুষ এখন চায় দৃশ্যমান পরিবর্তন: (ক) ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, (খ) জবাবদিহিতামূলক প্রতিষ্ঠান গড়া, (গ) রাষ্ট্রকে দুর্নীতিগ্রস্ত এলিট-নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করা, (ঘ) মানবিক মর্যাদা ও সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা করা, (ঙ) চাঁদাবাজমুক্ত নৈতিক মূল্যবোধের শাসন কাঠামো প্রতিষ্ঠিত করা, এবং (চ) রাজনৈতিক জীবন, আর্থিক লেনদেন, এবং শাসন কাঠামোর প্রতিটি ক্ষেত্রে ট্রান্সপারেন্সি, একাউন্টেবিলিটি, ইন্টিগ্রিটি বজায় রাখা।
এই প্রত্যাশাগুলোকে সামনে রেখে, জাতি “ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রীর” কাছ থেকে কতগুলো অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব পেতে উদগ্রীব। প্রশ্নগুলোর সঠিক জবাব পেলে জাতি যেমন আশ্বস্ত থাকবে, অন্যদিকে জনাব তারেক রহমানের মর্যাদা এবং গ্রহণযোগ্যতাও বেড়ে যেতে পারে।
প্রশ্ন এক:
তিনি যেহেতু প্রায় ১৮ বছর বিলেতে অবস্থান করেছেন, এ সময়ে দেশের উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য (বিশেষ করে শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি বা কোনো সামাজিক আন্দোলনে) কোনো অবদান রেখেছেন কি? পাশাপাশি, সেখানে পড়ালেখা করে দেশ পরিচালনার মতো কোনো জ্ঞান বা দক্ষতা অর্জন করেছেন কি? ব্যক্তিগতভাবে তিনি কী ধরনের কাজ বা পেশাগত অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন (রেস্টুরেন্টের মতো সাধারণ কাজ হলেও), এবং বিদেশে বসে বক্তব্য দেওয়ার বাইরে দল বা দেশের জন্য কী ধরনের বাস্তব অবদান রেখেছেন? একই সাথে এই ১৮ বছর বিলেতে থাকার খরচ কীভাবে এসেছে, সেটাও জাতি পরিষ্কারভাবে জানতে চায়।
প্রশ্ন দুই:
কিছুদিন আগে জনাব তারেক রহমান তার আম্মাজানের চরম অসুস্থতার সময় দেশে আসার প্রগাঢ় ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও আসতে পারেননি। বলেছিলেন, তার আসার ব্যাপারটা তার একার উপর নির্ভরশীল নয়। শেষমেষ তিনি দেশে এসেছেন, কিন্তু পুরো জাতির কাছে বিষয়টি এখনো ধোঁয়াশাপূর্ণ। তার আসার ব্যাপারটা আসলেই অন্য কাদের উপর নির্ভরশীল ছিল? তারা কারা? কী সেই জটিলতা? তিনি কীভাবে এই জটিলতা কাটিয়ে দেশের মাটিতে পা রাখলেন? এখানে, দেশ ও জনগণের কোনো স্বার্থ বিসর্জিত হয়েছে কিনা?
প্রশ্ন তিন:
আনন্দবাজার পত্রিকায় জনাব তারেক রহমানের সাথে দিল্লির তিনটি সমঝোতার কথা স্বীকার করা হয়েছে। ভারতের দেওয়া যে তিনটি শর্ত মেনে নিয়ে তারেক রহমান দেশে ফিরেছেন সেগুলো হলো: (ক) নির্বাচনের পরে আওয়ামী লীগের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে, পালাতক আওয়ামী নেতারা দেশে ফিরলে নিরাপত্তা দিতে হবে।
(খ) ভারতের সম্মতি ছাড়া বাংলাদেশের ডিফেন্সের জন্য কোনো যুদ্ধবিমান ও আধুনিক অস্ত্র বা সরঞ্জাম ক্রয় করতে পারবে না। এবং (গ) জামাতকে জ*ঙ্গি ট্যাগ দিয়ে গণহারে গ্রেফতার করে কারাগারে আটকে রাখতে হবে।
আমরা এখনো পর্যন্ত জনাব তারেক রহমান এবং বিএনপির পক্ষ থেকে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত এই খবরের প্রতিবাদ করে কোনো বিবৃতি দিতে দেখি নাই। তাহলে কি খবর সত্য? জাতি কি আবার ইন্ডিয়ার সাথে নতুন এক দাসত্ব চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে? জাতি এসব প্রশ্নের জবাব চায়, এক্ষুনি; নির্বাচনের আগেই।
প্রশ্ন চার:
গত দেড় বছরে আন্তঃকোন্দলে বিএনপি হত্যা করেছে দুইশোর বেশি; ধর্ষণেও সেঞ্চুরি পার করেছে! জাতির প্রশ্ন: যে দল নিজেদের নেতা-কর্মীদেরকেই নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ, সেই দল কীভাবে নিরাপদ বাংলাদেশ গড়বে? জাতি জানতে চায়: এতদিনে জনাব তারেক রহমান দলকে হত্যা, ধর্ষণ, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির সংস্কৃতি থেকে মুক্ত করতে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং সেগুলো কতটুকু কার্যকর হয়েছে? দেশে ফিরে অভ্যন্তরীণ কোন্দল দমনের মতো কঠিন কাজগুলো করার কোনো কার্যকর পরিকল্পনা কী কী?
প্রশ্ন পাঁচ:
দেশকে উজ্জীবিত করতে জনাব তারেক রহমান নতুন একটা স্লোগান শুনিয়েছেন: আই হ্যাভ এ প্লান। জাতির প্রশ্ন: এই স্লোগানটি মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের “আই হ্যাভ এ ড্রিম” থেকে ধার করা কিনা? ধার করলেও সমস্যা নেই। তবে সেটা অ্যাকনলেজ করলে জনাব তারেক রহমানের মর্যাদা আরো অনেক বেড়ে যাবে বৈ কমবে না। অন্যদিকে, ধার করে সেটার অ্যাকনলেজ না করলে জাতি চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ আনতে পারে। একইসাথে, জনাব তারেক রহমানের “প্লান” আসলেই কী, সে বিষয়টা জাতি পরিষ্কার জানতে চায়।
প্রশ্ন ছয়:
প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারসহ আরো কিছু ভারতপন্থী পত্রপত্রিকা গত জোট সরকার আমলে হাওয়া ভবনকে কেন্দ্র করে জনাব তারেক রহমানকে দুর্নীতির বরপুত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তাছাড়া “মিস্টার টেন পার্সেন্ট”, “খাম্বা তারেক”সহ নানান খেতাবে ভূষিত করেছিল। জাতির প্রশ্ন: এইগুলো যদি মিথ্যা ও বানোয়াট হয়ে থাকে, তাহলে জনাব তারেক রহমান এইসব ভারতপন্থী পত্রিকাগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেবেন কিনা। আর যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে নিজের দোষ স্বীকার করে জাতির কাছে ক্ষমা চাইবেন কিনা।
প্রশ্ন সাত:
শোনা যাচ্ছে, ২০০৮ সালের মতোই দেশে এবার বিএনপিকে জেতাতে আরেকটা একতরফা নির্বাচন আয়োজনে দেশি-বিদেশি চক্র পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক ওসমান হাদীর হত্যাকাণ্ড এবং প্রথম আলো-ডেইলি স্টারে হামলার পর ঐ চক্র তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। বিচার বিভাগ, আইন-আদালত, প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, সবগুলোই প্রায় শতভাগ বিএনপির চাওয়া মতে তাদের লোকদের দিয়ে সাজানো হয়েছে। সর্বশেষ গুমের বিচার প্রশ্নে তাদের অফিসারদের ইনডেমনিটি দেওয়ার শর্তে বিএনপি রাজি হয়ে যাওয়ায়, সেনাবাহিনীও এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অংশগ্রহণ করবে বলে সূত্রে প্রকাশ। জাতি জানতে চায় বিএনপি এই সাজানো, একতরফা নির্বাচনের যে পরিকল্পনার কথা শোনা যাচ্ছে, সেটার সাথে জড়িত কিনা। যেহেতু, সাজানো নির্বাচন নিয়ে কথা উঠছে, বিএনপি অবাধ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের ক্ষেত্রে একশ ভাগ কমিটেড কিনা, সেটাও জাতি জানতে চায়।
জনাব তারেক রহমানকে নিয়ে আবার শুরু হয়েছে ‘দেবতা’ বানানোর কার্যক্রম। বিএনপির অন্ধ সমর্থকরা তারেক রহমানের বিরুদ্ধে কিছু বললেই ঝাঁপিয়ে পড়ছে, তাকে দেবতার আসনে বসাতে চাচ্ছে। অথচ, আমরা জানি, জাতির নেতা হতে হলে সমালোচনা সহ্য করতে জানতে হয়। তা না হলে, শেখ হাসিনা আর জনাব তারেক রহমানের মধ্যে পার্থক্য কী? আশা করি, জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে এই অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর জবাব দিয়ে জনাব তারেক রহমান জাতিকে আশ্বস্ত করবেন।
