আসন্ন সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতিতে যেমন প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে, তেমনি তৎপর হয়ে উঠেছে অপতথ্য ছড়ানোর একটি সংঘবদ্ধ চক্র। মাঠের রাজনীতিতে ব্যর্থ হয়ে চিহ্নিত একটি গোষ্ঠী এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেই তাদের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। গোয়েন্দা সংস্থা ও বিভিন্ন বাহিনীর নাম জড়িয়ে সাজানো নথি, ভুয়া লেটারহেড এবং এআই দিয়ে তৈরি ডিপফেইক কনটেন্ট ছড়িয়ে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর এবারের নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। স্মরণকালের সর্বোচ্চসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমের জন্য উন্মুক্ত পরিবেশ এবং নির্বাচন কমিশনের কঠোর নজরদারির ফলে নির্বাচন ইতোমধ্যেই বিশ্বাসযোগ্যতার পথে এগিয়েছে। এই বাস্তবতায় যারা নির্বাচন বানচালের কৌশলে ব্যর্থ হয়েছে, তারাই এখন অপতথ্যের মাধ্যমে বিভ্রান্তি সৃষ্টিতে মরিয়া।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি তথাকথিত ‘গোপন নথিতে’ দাবি করা হয়, দেশের একটি শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা নাকি একটি রাজনৈতিক দলকে ৭৫ শতাংশ ভোট নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে। প্রথম দর্শনে নথিটি বিভ্রান্তিকর মনে হলেও, একটু খেয়াল করলেই এতে অসংখ্য অসংগতি চোখে পড়ে—বানান ও ভাষাগত ভুল, অস্বাভাবিক ফন্ট, অর্থহীন স্মারক নম্বর এবং এমনকি সংস্থাপ্রধানের ঠিকানায় সংস্থার নিজস্ব নির্দেশনা পাঠানোর মতো হাস্যকর বিষয়ও এতে রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভুয়া ওই লেটারহেডটি প্রথম ছড়ান সুব্রত কুমার সরকার নামের এক ব্যক্তি, যিনি আওয়ামী লীগের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত। তার পোস্টের পরপরই কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক ফেসবুক পেজ ও এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে একই কনটেন্ট কপি-পেস্ট করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। একই কৌশলে এর আগেও সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর নামে ভুয়া চিঠি প্রচার করা হয়েছিল, যা এই অপপ্রচার যে পরিকল্পিত—সে ধারণাকে আরও জোরালো করে।
আরও অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রথমে ভুয়া লেটারহেড ব্যবহার করে গুজব ছড়ানো হয়। পরে পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তি নিয়ন্ত্রিত ও পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে পরিচালিত বিভিন্ন ফেসবুক ও টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে একই গুজব ধারাবাহিকভাবে কপি-পেস্ট করে ছড়ানো হয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ড এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
অপতথ্য শনাক্ত করার কিছু সহজ লক্ষণ রয়েছে। ভুয়া নথিতে সাধারণত বানান ও ভাষাগত ভুল থাকে, সরকারি কাজে ব্যবহৃত হয় না—এমন ফন্ট দেখা যায় এবং স্মারক নম্বর বা সিল অস্বাভাবিক হয়। এসব লক্ষণ দেখলেই সন্দেহ করা উচিত। যারা সরকারি কাগজপত্রের সঙ্গে পরিচিত, তারা সহজেই এসব মিথ্যাচার শনাক্ত করতে পারেন।
এবারের সংসদ নির্বাচনের আগে সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দেশ-বিদেশে বড় কোনো আশঙ্কা নেই। অধিকাংশ ভোটার কেন্দ্রে উপস্থিত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ৬০ শতাংশ ভোট পড়লেই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়; বাংলাদেশে এর চেয়েও বেশি ভোট পড়বে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
এ কারণে নির্বাচন নিয়ে রাতের ভোট বা ভোট গণনায় কারচুপির আশঙ্কা নেই বললেই চলে। আইনগতভাবে এসব অনিয়মের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। এ অবস্থায় রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান—সামরিক বাহিনী, পুলিশ, আনসার, বিজিবি, গোয়েন্দা সংস্থা ও নির্বাচন কমিশনকে বিতর্কিত করাই একটি দেশবিরোধী গোষ্ঠীর প্রধান এজেন্ডায় পরিণত হয়েছে।
এই গোষ্ঠী এসব প্রতিষ্ঠানের নামে পক্ষপাত, ভোট বানচাল কিংবা নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার মতো নানা ধরনের গুজব ছড়াচ্ছে। দেশের জনগণকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা রাখতে হবে। জুলাইয়ের পর আর কোনো সংস্থার জনবিরোধী অবস্থান নেওয়ার সুযোগ নেই। সব প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করাই জুলাইয়ের অন্যতম বড় অর্জন।







