বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনীর ভেতরে ভারত ও আওয়ামী লীগের প্রতি তীব্র ঘৃণা সৃষ্টি হয় এবং সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে বিভাজন প্রকট আকার ধারণ করে। পেশাদার সেনা কর্মকর্তাদের একপাশে সরিয়ে অনুগত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন জাতীয় প্রকল্পে সেনাবাহিনীকে যুক্ত করে বাহিনীটিকে পরিকল্পিতভাবে দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়। এর মূল কারণ ছিল—শেখ হাসিনা মনে করতেন, একটি দুর্নীতিগ্রস্ত সেনাবাহিনীই তার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ।
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এ শতাধিক গুম ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অভিযুক্ত জিয়াউলের বিরুদ্ধে প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দিতে এসব কথা বলেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। প্যানেলের অপর সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ।
জবানবন্দিতে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, শেখ হাসিনা ১৯৯৬–২০০১ মেয়াদের শাসনামলের দুর্বলতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী সময়ে দেশ ও প্রশাসনের ওপর নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথে অগ্রসর হন। এ লক্ষ্যে তিনি সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতাদের বিচার করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় এবং সংবিধান লঙ্ঘনের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত করা হয়।
তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনা তার আত্মীয় মেজর জেনারেল তারিক আহম্মেদ সিদ্দীকিকে নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তারেক সিদ্দীকি প্রধানমন্ত্রী ও বাহিনী প্রধানদের মাঝখানে একপ্রকার ‘সুপার চিফ’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তার নিয়ন্ত্রণে চলে আসে ডিজিএফআই, এনএসআই, র্যাব, এনটিএমসি, আনসার ও বিজিবিসহ বিভিন্ন সংস্থা। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের ভেতরে চারটি শক্তিশালী চক্র গড়ে ওঠে।
প্রথমটি ছিল অপরাধ চক্র, যা ডিজিএফআই, এনএসআই, র্যাব ও এনটিএমসিকে ব্যবহার করে পরিচালিত হতো। এই চক্রের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন, হত্যা ও গুমের মতো অপরাধ সংঘটিত হয়। দ্বিতীয় চক্রটি ছিল তথাকথিত ‘ডিপ স্টেট’, যা এমএসপিএম, ডিজিএফআই ও এনএসআইয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে তিন বাহিনীর নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করত, যা অনেক সময় বাহিনী প্রধানদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল।
তৃতীয় চক্রটি ছিল কেনাকাটা ও সরবরাহ সংশ্লিষ্ট চক্র। এতে পিএসও, এএফডি, ডিজিডিপি এবং তিন বাহিনীর প্রধানরা যুক্ত ছিলেন। এই চক্রের মাধ্যমে সামরিক ও রাষ্ট্রীয় কেনাকাটায় প্রভাব বিস্তার করা হতো। চতুর্থ চক্রটি ছিল সামরিক প্রকৌশল চক্র। মেজর জেনারেল তারিক সিদ্দীকি ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের কর্মকর্তা হওয়ায় এ কোরের সিনিয়র অফিসারদের নিয়ে আলাদা একটি বলয় তৈরি করেন। তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন জাতীয় উন্নয়ন প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার করা হয়, যা অবৈধ অর্থ আয়ের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়।







