ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে পরিচয় যাচাই বাধ্যতামূলক হওয়ায় নারী ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে মুখ দেখাতে হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ভুয়া ভোট রোধে এ বিষয়ে কোনো ধরনের শিথিলতা দেখানো হবে না। তবে পর্দানশিন নারীদের মর্যাদা ও ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে কমিশন।
ইসি সূত্র জানায়, নারী ভোটারদের পরিচয় যাচাইয়ের জন্য প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে মহিলা পোলিং অফিসার ও নারী আনসার সদস্য নিয়োগ দেওয়া হবে। পর্দানশিন নারীদের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই পুরুষ কর্মকর্তার সামনে নেকাব বা বোরকা খুলতে বাধ্য করা যাবে না।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার আমার দেশ–কে বলেন, আইন অনুযায়ী প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ছবিসহ ভোটার তালিকা থাকবে। ভোট দেওয়ার আগে ভোটারের চেহারার সঙ্গে তালিকাভুক্ত ছবির মিল নিশ্চিত করাই ভোট পরিচালনা বিধির বাধ্যতামূলক অংশ। পরিচয় যাচাই না হলে ব্যালট পেপার দেওয়া সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, কোনো নারী ভোটার যদি পুরুষ কর্মকর্তার সামনে মুখ দেখাতে অনিচ্ছুক হন, তাহলে মহিলা পোলিং অফিসারের মাধ্যমে পরিচয় যাচাই করা হবে। নারী কর্মকর্তার কাছে মুখ দেখালে পর্দা ভঙ্গ হবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ইসিসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ভোটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ছবিসহ ভোটার তালিকার সঙ্গে ভোটারের চেহারা মিলিয়ে ব্যালট পেপার প্রদান করতে হবে। তবে কোনো কেন্দ্রে মহিলা কর্মকর্তা না থাকলে এবং কোনো নারী ভোটার মুখ দেখাতে অনিচ্ছুক হলে তাকে জোর করে ভোট দিতে বাধ্য করা যাবে না। সে ক্ষেত্রে ভোট না দিলেও তার বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই।
আইন বিশেষজ্ঞ ও ইসলামি চিন্তাবিদরা বলছেন, পরিচয় যাচাইয়ের প্রয়োজনে মুখ দেখানো আইনগত ও ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে বৈধ। তবে যেখানে বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে নারীর পর্দা রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও নির্বাচন কমিশনের।
ইসলামি চিন্তাবিদ মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী আমার দেশ–কে বলেন, পরিচয় নিশ্চিত করার প্রয়োজনে মুখ দেখানো ইসলামে জায়েজ। তবে নারী কর্মকর্তার মাধ্যমে যাচাইয়ের সুযোগ থাকলে সেটিই গ্রহণ করা উত্তম। কোনো নারী ভোটার যদি ওই পরিস্থিতিতে ভোট দিতে না চান, তাহলে ব্যালট না নিয়ে ফিরে গেলে তাতে কোনো গুনাহ বা আইনি অপরাধ হবে না।
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, আসন্ন নির্বাচনে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ হবে। ফলে ইভিএমের মতো আঙুলের ছাপ মিলিয়ে পরিচয় যাচাইয়ের সুযোগ থাকছে না। এ কারণে এবার ভোটারের পরিচয় নিশ্চিত করা হবে মূলত চেহারা ও ছবির মিলের মাধ্যমে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২ অনুযায়ী, ভোটাধিকার প্রয়োগের সময় ভোটারের পরিচয় নিশ্চিত করা নির্বাচন কর্মকর্তার আইনগত দায়িত্ব। একই সঙ্গে ভোটারের সম্মান, মর্যাদা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে বলা হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা জানান, আরপিওতে সরাসরি ‘পর্দা’ শব্দটি উল্লেখ না থাকলেও নারী ভোটারের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে—এমন কোনো আচরণ আইনসম্মত নয়। এ কারণেই নির্বাচন কমিশন দীর্ঘদিন ধরে নারী ভোটারদের জন্য নারী পোলিং অফিসার ও নারী আনসার নিয়োগের নির্দেশনা দিয়ে আসছে।
ব্যারিস্টার তাজরিয়ান আকরাম হোসাইন আমার দেশ–কে বলেন, মুখ না দেখালে কাউকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভুয়া ভোটার বলা যাবে না। তবে ভোট দিতে চাইলে পরিচয় যাচাই মানতেই হবে। এটি শুধু আইনগত বাধ্যবাধকতাই নয়, বরং সুষ্ঠু নির্বাচন ও রাষ্ট্র পরিচালনার স্বার্থেও জরুরি।







