বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আয়োজিত জাতীয় গণভোট ও সংসদ নির্বাচনের পর দেশ নতুন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর ওপর ভিত্তি করে হওয়া গণভোটে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ ভোটার সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে ফলাফল বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে বিজয়ী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং তাদের সাবেক মিত্র বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর মধ্যে প্রকাশ্য মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানে এই বিরোধ আরও প্রকট হয়। সংবিধান রক্ষার শপথ নিলেও বিএনপির সংসদ সদস্যরা ‘সংবিধান সংস্কার কাউন্সিল’-এর সদস্য হিসেবে দ্বিতীয়বার শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানান।
জুলাই সনদ অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য এই কাউন্সিল গঠন বাধ্যতামূলক। বিএনপির অবস্থানের ফলে কাউন্সিলের বৈধতা ও সংস্কার প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিরোধের অন্যতম কারণ সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন পদ্ধতি। জুলাই সনদে ৩৫০ আসনের জাতীয় সংসদের পাশাপাশি ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। জামায়াতে ইসলামী এবং ছাত্র আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক কমিটি চায় উচ্চকক্ষের নির্বাচন ‘আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’ পদ্ধতিতে হোক। এতে দলগুলো প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে আসন পাবে।
অন্যদিকে বিএনপি বর্তমান ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ বা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ভিত্তিক পদ্ধতি বহাল রাখতে আগ্রহী, যা তাদের বড় সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে সহায়ক হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, তারা সংস্কার বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেও বর্তমান পর্যায়ে কাউন্সিলকে বৈধ মনে করছেন না। তাদের মতে, নির্বাচিত সংসদের অনুমোদনের পরই কাউন্সিল আইনি ভিত্তি পাবে।
অন্যদিকে জামায়াত ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতারা বিএনপির এই অবস্থানকে সংস্কার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার কৌশল হিসেবে দেখছেন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর শান্তিতে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ প্রণয়ন করে। এতে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নির্ধারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধিসহ ৮০টির বেশি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
১৮০ দিনের মধ্যে এসব সংস্কার বাস্তবায়নের আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মতপার্থক্য দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
