চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ একাধিক নতুন রাজনৈতিক দল ও শতাধিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে ওঠে। সময়ের ব্যবধানে এসব সংগঠনের মধ্যে কিছুটা বিচ্ছিন্নতা তৈরি হলেও সম্প্রতি তাদের মধ্যে যোগাযোগ ও আলোচনার গতি বেড়েছে।
পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় জুলাই আন্দোলনের পক্ষের শক্তিগুলো বৃহত্তর ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে।
জানা গেছে, নতুন রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানো, নিষ্ক্রিয় নেতাদের সক্রিয় করা এবং বিচ্ছিন্ন জুলাই শক্তিগুলোকে একত্রিত করার বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে। একই সঙ্গে কিছু সংগঠনের মধ্যে একীভূত হওয়ার উদ্যোগও চলছে।
তবে এই আলোচনার মধ্যেই এনসিপি থেকে বেরিয়ে যাওয়া কয়েকটি অংশ পৃথক প্ল্যাটফর্ম গঠন করেছে। সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও জুলাই আন্দোলনের সংগঠক মাহফুজ আলমের নেতৃত্বে একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম গঠনের ঘোষণা এসেছে। এর আগে বামঘরানার একটি অংশ ‘নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন’ এবং অন্য একটি অংশ ‘গণবিপ্লবী উদ্যোগ’ নামে আলাদা সংগঠন তৈরি করেছে। সম্প্রতি ‘অলটারনেটিভস’ নামেও একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম আত্মপ্রকাশ করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে জুলাই শক্তিগুলো নতুন করে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে রয়েছে—সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে অনিশ্চয়তা, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে রাজনৈতিক মতপার্থক্য, ফ্যাসিবাদী শক্তির পুনরুত্থানের আশঙ্কা এবং জুলাই আন্দোলনের মামলাগুলোর বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতি।
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, বিচার ও সংস্কারের প্রশ্নে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যারা সংস্কার ও বিচারপ্রক্রিয়ার পক্ষে আন্তরিক, তাদের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে এনসিপি আগ্রহী।
এনসিপির নেতারা জানান, জুলাই আন্দোলনের চেতনায় বিশ্বাসী সব শক্তির জন্য তাদের দরজা খোলা। ডান কিংবা বাম—যে মতাদর্শেরই হোক, জুলাই শক্তিগুলোকে স্বাগত জানানো হবে। যারা রাজনৈতিক দলে যুক্ত না হয়ে আন্দোলনভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে কাজ করতে চান, তাদের প্রতিও সমর্থন থাকবে।
সূত্র জানায়, ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশ (আপ বাংলাদেশ) এবং আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির কিছু নেতার সঙ্গেও এনসিপির আলোচনা চলছে। ভবিষ্যতে এসব সংগঠনের একটি অংশ এনসিপির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ এবং গণভোটের বৈধতা নিয়ে আদালতে রিট হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, জনগণের রায়কে প্রশ্নবিদ্ধ করার কোনো চেষ্টা মেনে নেওয়া হবে না। প্রয়োজনে রাজপথে আন্দোলনে নামারও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
জুলাই শক্তিগুলোর দাবি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নেতৃত্ব পরিবর্তন, জুলাই আন্দোলনের মামলাগুলোর ধীরগতি এবং প্রশাসনে দলীয়করণের অভিযোগ নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এসব কারণে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সরকারের ওপর চাপ তৈরির পরিকল্পনা করছে।
এ লক্ষ্যে এনসিপি সম্প্রতি দুটি কমিটি গঠন করেছে—‘সংস্কার বাস্তবায়নবিষয়ক কমিটি’ এবং ‘জুলাই গণহত্যা ও গুমের বিচার পর্যবেক্ষণবিষয়ক কমিটি’। এসব কমিটি নিয়মিত ব্রিফিং, জনমত গঠন এবং সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল নির্ধারণ করবে।
রাজনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, জুলাই আন্দোলনের চেতনা বাস্তবায়নের দাবিতে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
ভবিষ্যতে এনসিপির নেতৃত্বে কয়েকটি সংগঠন একীভূত হতে পারে এবং অন্যগুলো আলাদা থেকেও যৌথ কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় জুলাই শক্তিগুলোর ঐক্য গড়ে উঠলে তা দেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
