একটি মানুষের জীবন কখনোই কেবল একটি সংখ্যা নয়। একটি প্রাণ ঝরে গেলে ভেঙে পড়ে একটি পরিবার, থেমে যায় অসংখ্য স্বপ্ন এবং অন্ধকারে ডুবে যায় অনেক মানুষের ভবিষ্যৎ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা, হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণের ঘটনার ধারাবাহিকতায় মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর ও তথ্যসূত্র অনুযায়ী, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে প্রায় এক মাসে বিএনপিনেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে অন্তত ২৮৯টি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে ১৫টি হত্যাকাণ্ড এবং ৫টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, নিহতদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর অন্তত ৩ নেতা–কর্মী রয়েছেন।
এদিকে গত ৩ মার্চ ফেসবুক পোস্ট ও মন্তব্যকে কেন্দ্র করে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় মো. ইদ্রিস (৪৫) নামে এক ব্যক্তিকে মারধর করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক যুবদল নেতার বিরুদ্ধে। জানা যায়, ইদ্রিস ঢাকায় সবজি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন চলাকালে তিনি স্থানীয় বিএনপি নেতা জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে গরু চুরি ও বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ তুলে ফেসবুকে পোস্ট ও মন্তব্য করেন। এতে ক্ষিপ্ত হন জহিরুল ইসলাম।
পরিবারের সদস্যরা জানান, কিছুদিন আগে ইদ্রিস ঢাকা থেকে বাড়িতে আসেন। পরে ২৬ ফেব্রুয়ারি পাখিমারা বাজারে গেলে জহিরুল ও তার সহযোগীরা তাকে ইউনিয়ন যুবদলের কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে মারধর করেন। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে স্বজনরা তাকে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে নারায়ণগঞ্জের ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে চিকিৎসা করান। কিন্তু ২ মার্চ রাতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
অন্যদিকে ৭ মার্চ রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলায় ঈদগাহ মাঠে ঈদের নামাজের ইমাম নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে আলাউদ্দিন (৫৬) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। রাত আটটার দিকে উপজেলার কেশরহাট পৌরসভার সাঁকোয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত আলাউদ্দিন স্থানীয় জামায়াতের একজন কর্মী ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, ইমাম নির্বাচন নিয়ে বিরোধের জেরে বিএনপি সংশ্লিষ্ট কর্মীদের হামলায় তিনি নিহত হন।
চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলায় সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় ইমাম হোসেন (২৫) নামে এক ছাত্রদল নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তিনি বারৈয়ারহাট বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং বারৈয়ারহাট পৌরসভার জামালপুর গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের ছেলে। পুলিশ জানায়, ২৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় জামালপুর গ্রামের একটি পুকুরপাড়ের বাগানে নিয়ে নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করে ওই ছাত্রীকে পালাক্রমে ধর্ষণ করা হয়। পরে ঘটনা কাউকে না জানাতে ভুক্তভোগীকে হুমকি দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় কিশোরীর মা ৩১ জানুয়ারি রাতে জোরারগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় ইমাম হোসেনসহ আরও দুইজনহৃদয় (২৫) ও রানা (২৭)—কে আসামি করা হয়েছে।
এভাবেই হত্যাকান্ড/ধর্ষন সহ নানা অপরাধ যেন মামুলি কোনো বিষয়ে পরিনত হয়েছে, যা নিয়মিতই তুচ্চ্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘটাচ্ছে বিএনপি কর্মীরা।
নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব সহিংসতা ও অপরাধের ঘটনায় দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সমালোচকদের দাবি, বিএনপির দলীয় প্রধান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখনো এসব ঘটনায় দৃশ্যমান কোনো কঠোর পদক্ষেপ বা স্পষ্ট অবস্থান জানাননি।
পর্যবেক্ষকদের মতে, দলের নেতা–কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে সে বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা না থাকায় জনমনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে।
আরও নানা অপরাধের অভিযোগ
এছাড়াও বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমের সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ১২ মার্চ পর্যন্ত নির্বাচন পরবর্তী এক মাসে বিএনপি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অপরাধের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— ১৫টি খুন, ৫টি ধর্ষণ, ৪৮টি চাঁদাবাজি, ১১০টি হামলা বা সংঘর্ষ, ৫টি লুটপাট, ১৩টি দখলের ঘটনা, ১১টি মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধ, ১৪টি চুরি বা ডাকাতি, ১২টি শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, ৮টি আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের অভিযোগ, ৩টি টেন্ডারবাজি, ৫টি গুজব ও মিথ্যাচার, ৮টি নারী নির্যাতন, ৪টি দুর্নীতি, ৪টি হুমকি, ৩টি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা এবং ২১টি বিভিন্ন ধরনের অপরাধের খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এছাড়াও গণমাধমের সূত্রে আরো জানা গেছে , ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে বিএনপি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অপরাধের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে— ৬৯টির বেশি ধর্ষণ, ৩১৮টির বেশি চাঁদাবাজি, ১০১টির বেশি দখল, ৭৪টির বেশি চুরি বা ডাকাতি, ৫৬টির বেশি নারী নির্যাতন, ৮৫টির বেশি লুটপাটের ঘটনা
এসব ঘটনায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে বলে জানা গেছে।
সুষ্ঠু তদন্তের দাবি
নিহতদের পরিবার ও ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগীদের স্বজনরা প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে প্রতিটি অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা না গেলে সমাজে সহিংসতার সংস্কৃতি আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
