জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে সরকার এক ধরনের সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যে রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা। নির্বাচনে জয়লাভের পর থেকেই এ বিষয়ে সরকারের অবস্থানে দ্বিধা ও অস্পষ্টতা দেখা যাচ্ছে।
নির্বাচনী প্রচারণার সময়ও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ নিয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারক ও তৃণমূল পর্যায়ে সুস্পষ্ট অবস্থান দেখা যায়নি। এর প্রতিফলন গণভোটের ফলাফলেও দেখা গেছে—অনেক আসনে বিএনপি প্রার্থী বিজয়ী হলেও সেখানে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট পরাজিত হয়েছে।
এদিকে সম্প্রতি হাইকোর্টে গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা একটি মামলায় সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ ‘কেন গণভোট অবৈধ ঘোষণা করা হবে না’—এ মর্মে রুল জারি করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ গণপ্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অভিযোগ রয়েছে, এ রুল জারির পেছনে সরকারের নীরব সমর্থন থাকতে পারে। মামলায় বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের সক্রিয় ভূমিকাও লক্ষ্য করা গেছে। ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের প্রকৃত অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং বিষয়টি সংসদে আলোচনার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে চায়।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের দিনই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরও শপথ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি ও তাদের মিত্ররা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেননি। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোটের ৭৭ জন প্রতিনিধি দুটি পদেই শপথ নিয়েছেন।
এছাড়া আদেশ অনুযায়ী গণভোটের ফলাফলের গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত এমন কোনো অধিবেশন ডাকা হয়নি। এ অবস্থায় জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট সরকারকে আল্টিমেটাম দিয়েছে—রোববারের মধ্যে পরিষদের বৈঠক না ডাকলে আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, জুলাই আন্দোলনের পর রাষ্ট্রীয় সংস্কারের উদ্যোগ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন কমিশন গঠন করে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ‘জাতীয় জুলাই সনদ’ প্রণয়ন করে। পরে বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এ সনদে স্বাক্ষর করে।
সেই সনদের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ–২০২৫’ জারি করেন এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হলে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও কাজ করবেন—এমন বিধান আদেশে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এখনো সেই প্রক্রিয়া পুরোপুরি শুরু হয়নি, যা সংস্কার কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিদ্যমান সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আলাদা শপথের বিধান নেই। তাই এ ধরনের শপথ গ্রহণের আগে প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে এবং বিষয়টি সংসদে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গণভোটের রায়কে সম্মান জানাতে হলে প্রথমে সংসদে আলোচনা ও আইন প্রণয়নের মাধ্যমে তা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অন্যদিকে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, এই বিষয়ে সরকারের অবস্থান সংসদেই তুলে ধরা হবে।
অন্যদিকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন দ্রুত আহ্বানের দাবি জানিয়েছে বিরোধীদল। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, গণভোটের রায় যেহেতু সংস্কারের পক্ষে এসেছে, তাই সংসদের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশনও ডাকা উচিত ছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত না হলে তা আইনি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. তারেক ফজল বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এ বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন, নইলে পুরো সংস্কার প্রক্রিয়াই জটিলতার মুখে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গণভোটে জনগণের রায় বাস্তবায়নে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর সুস্পষ্ট অবস্থান জরুরি। অন্যথায় সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে।
