ইরানের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রধান আলি লারিজানির মৃত্যু নিশ্চিত করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। গত ১৬ মার্চ এক ইসরাইলি বিমান হামলায় তিনি নিহত হন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরাইলি বিমান হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শাহাদাতের পর লারিজানিকে ইরানের ‘দে ফাক্তো’ বা কার্যত নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। ইসরাইলের ধারণা, লারিজানির মৃত্যুতে ইরানের নেতৃত্ব বড় ধরনের সংকটে পড়বে।
মৃত্যুর মাত্র কয়েক দিন আগে আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আলি লারিজানি অত্যন্ত দৃঢ়কণ্ঠে বলেছিলেন, শীর্ষ নেতাদের হত্যা করে ইরানকে দুর্বল করা যাবে না, বরং এতে বিপ্লব আরও শক্তিশালী হবে। তাঁর ভাষ্য ছিল, “আমাদের হত্যা করুন, আমাদের জাতি আরও বেশি জাগ্রত হবে।” তিনি বিশ্বাস করতেন, শাহাদাত বরণের মাধ্যমে বিপ্লবের আদর্শ আরও বেগবান হয়।
সাক্ষাৎকারে লারিজানি তাঁর আধ্যাত্মিক গুরু আয়াতুল্লাহ খামেনির উদ্ধৃতি টেনে বলেছিলেন, শত্রুরা মনে করছে শীর্ষ নেতাদের শহীদ করে তারা বড় জয় পেয়েছে, কিন্তু ইরানি জনগণ এখন শোককে শক্তিতে রূপান্তর করেছে। গত ১৩ মার্চ তেহরানের কুদস দিবসের র্যালিতে তাঁকে শেষবারের মতো জনসমক্ষে দেখা গিয়েছিল। সেখানে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে সতর্ক করেছিলেন যে, ইরানি জাতির সংকল্প বুঝতে ভুল করলে ট্রাম্প নিজেই নির্মূল হয়ে যেতে পারেন।
৬৭ বছর বয়সী আলি লারিজানি ছিলেন ইরানের একটি প্রভাবশালী আলেম পরিবারের সন্তান। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর তাঁর পরিবার ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসে। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা লারিজানি পরবর্তীতে ১০ বছর ইরানের জাতীয় সম্প্রচার মাধ্যমের প্রধান এবং টানা ১২ বছর পার্লামেন্ট স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
পশ্চিমাদের সাথে পরমাণু আলোচনা থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ নীতি নির্ধারণ—সবক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন আয়াতুল্লাহ খামেনির সবচেয়ে বিশ্বস্ত সেনাপতি। যদিও তিনি কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তবে কূটনীতি এবং বাস্তবসম্মত উপায়ে লক্ষ্য অর্জনে তিনি দক্ষ ছিলেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি দেশবাসীকে সতর্ক করেছিলেন যে, এই আগ্রাসনের মূল উদ্দেশ্য হলো ইরানকে খণ্ডবিখণ্ড করা।
আলি লারিজানির মৃত্যু ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে একটি বিশাল শূন্যতা তৈরি করলেও, তাঁর শেষ বার্তাগুলো এখন দেশটিতে প্রতিরোধের মন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেহরানের অলিতে-গলিতে এখন তাঁর সেই সতর্কবার্তা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে— ‘শহীদরা বিপ্লবকে আরও শক্তিশালী করে’।
