দেড় লাখ ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ক্রয়কে ঘিরে কয়েক হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠে এসেছে দুটি গোয়েন্দা সংস্থার পৃথক প্রতিবেদনে। এতে দাবি করা হয়েছে, প্রকল্পটির নেপথ্যে সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ‘টাইগার আইটি’র প্রভাব ছিল। তবে এসব অভিযোগের পরও কার্যকর তদন্ত না হওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুরু থেকেই প্রকল্পটি অনিয়মের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়। অনুমোদন, মূল্য নির্ধারণ, ক্রয় ও বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ ছিল। তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার নুরুল হুদা ১৫০টি আসনে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা ঘোষণা করলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র ছয়টি আসনে এটি ব্যবহৃত হয়।
প্রতিটি ইভিএমের মূল্য ধরা হয় প্রায় ২ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। সে হিসেবে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ৩,৫১৫ কোটি টাকা। অথচ অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকৃত বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৩৪৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ শুধু ক্রয় প্রক্রিয়াতেই প্রায় ৩,১৭২ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে।
অডিটে আরও বলা হয়, ২০২১-২২ অর্থবছরে ইভিএমসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ১,১৯৫ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদনের আগে কোনো বাস্তবসম্মত সমীক্ষা করা হয়নি এবং সীমিত একটি গোষ্ঠীর সিদ্ধান্তই প্রাধান্য পেয়েছে।
এ প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত হিসেবে কয়েকজন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ‘টাইগার আইটি’র সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠে এসেছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এত বড় প্রকল্পে ইভিএম সংরক্ষণ, পরিবহন বা মেরামতের জন্য কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। বর্তমানে দেড় লাখ মেশিনের মধ্যে সচল রয়েছে মাত্র ৪০ হাজার। বাকিগুলোর মধ্যে অনেকগুলো অকেজো এবং বড় অংশ মেরামতযোগ্য অবস্থায় পড়ে আছে।
পরবর্তীতে মেশিনগুলো মেরামতের জন্য বিপুল অর্থের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা অনুমোদন পায়নি। ফলে প্রকল্পটি এখন প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
বর্তমান নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনও একই সুপারিশ করেছে। এতে প্রায় ৩,৮২৫ কোটি টাকার প্রকল্পটি কার্যত ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
