বাংলার ঐতিহ্যবাহী নববর্ষের প্রকৃত সময় পহেলা বৈশাখ নয়, বরং ‘পহেলা অগ্রহায়ণ’ বলে দাবি করছেন ইতিহাস গবেষক ও সংশ্লিষ্টরা। বাংলা পঞ্জিকার ১২টি মাসের মধ্যে ১১টিই নক্ষত্রের নামে নামকরণ করা হলেও একমাত্র অগ্রহায়ণ মাসের নামটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বছরের শুরুর ইতিহাস। ‘অগ্র’ শব্দের অর্থ প্রথম এবং ‘হায়ণ’ শব্দের অর্থ বছর; অর্থাৎ বছরের অগ্রে বা শুরুতে অবস্থান করার কারণেই এই মাসটির নাম অগ্রহায়ণ।
প্রাচীন গ্রন্থ শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণের প্রিয় মাস হিসেবে অগ্রহায়ণের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা এই মাসটির সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের প্রমাণ দেয়। ঐতিহাসিকভাবে বাংলা নববর্ষের আদি অনুষ্ঠান হিসেবে ‘আমানি’ উৎসবের কথা জানা যায়, যা মূলত ছিল কৃষকের উৎসব এবং পহেলা অগ্রহায়ণে পালিত হতো। নবান্ন ও নতুন ধানের ঘ্রাণে গ্রাম বাংলা এই সময়েই উৎসবের আমেজে মেতে উঠত।
মুঘল সম্রাট আকবরের সময় থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে বৈশাখ মাসকে বছরের প্রথম মাস হিসেবে প্রচলন করা হয়। তবে আধুনিক পহেলা বৈশাখ উদযাপনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় অনেক পরে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবারে এর সূচনা হয় এবং পরবর্তীতে শান্তিনিকেতনে এটি ঘটা করে পালন করা শুরু হয়। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের হাত ধরে এটি ধীরে ধীরে নাগরিক উৎসবে রূপ নেয়।
তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৬১ সালে ছায়ানট প্রতিষ্ঠার পর ১৯৬৭ সাল থেকে রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের প্রচলন হয়। তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকরা এই অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করায় বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রতীকে পরিণত হয় বৈশাখী উৎসব। এভাবে গ্রামীণ ঐতিহ্যের নবান্ন বা আমানি উৎসবের পরিবর্তে মুঘল প্রবর্তিত বৈশাখ মাসটি ইংরেজি ও পাশ্চাত্য ঢঙের বর্ষবরণ হিসেবে জনপ্রিয়তা পায়।
সমালোচকদের মতে, বৈশাখের কালবৈশাখী ঝড় ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে আনন্দ উৎসব করা অনেকটা বেমানান। প্রকৃতির রুদ্ররোষের চেয়ে অগ্রহায়ণের মনোরম আবহাওয়া এবং নতুন ফসলের আনন্দই নববর্ষের জন্য বেশি মানানসই ছিল। অগ্রহায়ণই ছিল বাঙালির সংস্কৃতির আদি শিকড়, যা কালের বিবর্তনে এবং শহুরে সংস্কৃতির চাপে কিছুটা বিস্মৃত হয়ে গেছে।
নিজেদের হারানো ইতিহাস পুনরুদ্ধারে আবারও পহেলা অগ্রহায়ণে নববর্ষ উদযাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন অনেকে। ভিনদেশি বা আরোপিত সংস্কৃতির পরিবর্তে শেকড়ের টানে নবান্নকেন্দ্রিক এই ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনার মাধ্যমেই বাঙালির আদি সংস্কৃতি রক্ষা করা সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে।
