মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দেশের জেলা শহরগুলোতে লোডশেডিং পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চাহিদার অর্ধেকে নেমে আসায় দিন-রাতে ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় অন্ধকারে থাকতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। এলাকাভেদে এক ঘণ্টার লোডশেডিংয়ের কথা থাকলেও রাজধানী ঢাকার বাইরে গড়ে দুই থেকে তিন ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। তীব্র গরমে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে এবং শিল্প-কারখানায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
চট্টগ্রামে প্রতিদিন গড়ে সাত থেকে আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না, তবে গ্রামে পরিস্থিতি আরও করুণ। সেখানে ২২ ঘণ্টার মধ্যে ১০ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ মিলছে না বলে গ্রাহকরা অভিযোগ করেছেন। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, পিক-আওয়ারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম থাকায় দীর্ঘ সময় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। গরমে অতিষ্ঠ নগরবাসী ও ব্যবসায়ীরা দ্রুত এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ চাইলেও সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার কোনো নিশ্চয়তা মিলছে না।
বরিশাল ও এর আশপাশের জেলাগুলোতে চাহিদার অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ৯০ থেকে ৯৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মাত্র ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ায় দিন-রাতে অন্তত পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা লোডশেডিং করতে হচ্ছে। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে দোকানপাট বন্ধের সরকারি নির্দেশনা থাকলেও দিনের বেলায় বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
ময়মনসিংহ জোনের ছয় জেলায় প্রতিদিন ৩২৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। জ্বালানি সংকটের কারণে স্থানীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে শহর এলাকায় চার-পাঁচ ঘণ্টা এবং গ্রাম এলাকায় তার দ্বিগুণ সময় লোডশেডিং থাকছে। তবে কৃষি এলাকায় হালকা বৃষ্টি হওয়ায় সেচ কাজে কিছুটা স্বস্তি মিললেও সাধারণ মানুষ বিদ্যুৎহীন অবস্থায় দুর্বিষহ সময় পার করছেন।
সিলেটেও দিনে-রাতে সমানতালে লোডশেডিং চলছে, যার প্রভাব পড়ছে আসন্ন এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ওপর। বিউবো ২৫ শতাংশ লোডশেডিংয়ের দাবি করলেও বাস্তবে নয়-দশ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না বলে বাসিন্দারা জানিয়েছেন। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, দিনের অর্ধেক সময় বিদ্যুৎ না থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করা ছাড়া উপায় থাকবে না। একই অবস্থা বিরাজ করছে রংপুর ও খুলনা বিভাগেও। রংপুরের গ্রাম অঞ্চলে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে, আর খুলনায় এক ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ যাওয়া-আসা করছে।
বর্তমানে গ্যাস ও ফার্নেস তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো চাহিদামতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছে না। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন স্বাভাবিক থাকলেও জাতীয় গ্রিডে বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যাওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে বিতরণ সংস্থাগুলো। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পাওয়ায় চার্জার ফ্যান বা আইপিএস সচল রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে, যা সাধারণ মানুষের ভোগান্তিকে চরম সীমায় নিয়ে গেছে।
বৈশ্বিক এই অস্থিরতা কবে নাগাদ কমবে সে সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য না থাকায় বিদ্যুৎ বিভাগও কোনো সুনির্দিষ্ট আশার বাণী শোনাতে পারছে না। ফলে সামনের দিনগুলোতে তাপমাত্রা আরও বাড়লে লোডশেডিং পরিস্থিতি আরও নাজুক হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।







