ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্য সেন হলে শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদিকে ঘিরে দেয়াললিখন মুছে ফেলা নিয়ে ছাত্রদল ও ইনকিলাব মঞ্চের মধ্যে তীব্র বিরোধ দেখা দিয়েছে। দেয়াললিখন ঘিরে শুরু হওয়া এই বিরোধ পরে পাল্টাপাল্টি লেখা, বানান ভুল নিয়ে কটাক্ষ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তর্ক-বিতর্কে গড়ায়।
হলের শিক্ষার্থীরা জানান, গত ১৪ এপ্রিল পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে ছাত্রদলের আলপনা আঁকার কার্যক্রম থেকে মূলত বিরোধের সূত্রপাত হয়। এ সময় হলের ফটকের কাছে লেখা ‘Justice For Hadi’ দেয়াললিখনটি মুছে দেন ছাত্রদল কর্মীরা। এরপর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পক্ষে-বিপক্ষে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
শরিফ ওসমান হাদি, যিনি ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ছিলেন, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হন। পরবর্তীতে চিকিৎসার জন্য তাঁকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হলেও ছয় দিন পর ১৮ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর অনুসারীরা তাঁকে জুলাই অভ্যুত্থানের প্রতিবাদী মুখ হিসেবে বিবেচনা করেন।
ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে ১৬ এপ্রিল দিনভর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে দেয়াললিখন কর্মসূচি পালন করে ইনকিলাব মঞ্চ। সূর্য সেন হলে মুছে ফেলা জায়গায় লেখা হয়, ‘আমরা আমাদের শত্রুর সাথেও ইনসাফ করতে চাই’। পাশাপাশি ‘জাস্টিস ফর হাদি’ ও ‘ইনসাফ ফর বাংলাদেশ’সহ বিভিন্ন স্লোগানও লেখা হয়।
তবে ওই দিন রাতেই ইনকিলাব মঞ্চের করা দেয়াললিখনের ওপর কালো রঙ দিয়ে পাল্টা লেখা দেয়ার অভিযোগ ওঠে। সেখানে ‘হাদি ব্যবসায়ীরা নিপাত যাক, ওসমান হাদি বিচার পাক’ এবং ‘হাদি ব্যবসা বন্ধ’, ‘দিস ইজ বিজনেস’ এ ধরনের ব্যঙ্গাত্মক বাক্য লেখা হয়। ইনকিলাব মঞ্চের দাবি, এসব কাজ ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরাই করেছে।
এরপর দেয়াললিখনের বানান ভুল নিয়েও শুরু হয় নতুন বিতর্ক। ছাত্রদলের কর্মীরা ‘ব্যবসা’ শব্দটি প্রথমে ভুল বানানে লিখে পরে তা সংশোধন করেন। অন্যদিকে ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে ‘Justice For Hadi’ লেখার সময় ‘Jusice For Hadi’ লেখা হয়, যা নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়।
ইনকিলাব মঞ্চের নেত্রী এবং ডাকসুর সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা এই ভুল বানান নিয়ে ছাত্রদলকে কটাক্ষ করে ফেসবুকে পোস্ট দেন। একইসঙ্গে ডাকসুর আরেক সম্পাদক উম্মে সালমাও সমালোচনায় অংশ নেন। তবে পরবর্তীতে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করা হলে দেখা যায়, ভুল ইংরেজি বানানটি ইনকিলাব মঞ্চের এক নারী সদস্য লিখেছেন।
ভিডিও প্রকাশের পর ফাতিমা তাসনিম জুমা ও উম্মে সালমা তাঁদের আগের সমালোচনামূলক পোস্ট সরিয়ে নেন। পরে ফাতিমা তাসনিম ভুলের দায় স্বীকার করে জানান, ভিড় ও ব্যস্ততার মধ্যে অসাবধানতাবশত এই ভুল হয়েছে এবং বিষয়টি তিনি সংশ্লিষ্টদের কাছে স্পষ্ট করেছেন।
এদিকে ছাত্রদলের সূর্য সেন হল শাখার সদস্যসচিব আবিদুর রহমান মিশু দাবি করেন, নববর্ষ উপলক্ষে আলপনা ও দেয়াললিখনের অংশ হিসেবে একটি জায়গায় ‘Justice For Hadi’ লেখা মুছে সেখানে ‘শুভ নববর্ষ’ লেখার পরিকল্পনা ছিল। তিনি বলেন, হাদির প্রতি তাঁদের কোনো বিদ্বেষ নেই এবং তাঁর হত্যার বিচারও তারা চান।
অন্যদিকে ‘হাদি ব্যবসা’ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে ফাতিমা তাসনিম বলেন, তারা কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়, বরং শুধু ওসমান হাদির হত্যার বিচার দাবি করেই আন্দোলন করছেন। তবে ছাত্রদলের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, যদি তারাও বিচার চান, তাহলে এ বিষয়ে তাদের আরও সক্রিয় হওয়া উচিত।
সব মিলিয়ে একটি দেয়াললিখনকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ এখন দুই সংগঠনের মধ্যে রাজনৈতিক ও আদর্শিক দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে, যা ক্যাম্পাসজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।







