বিশাল ভর্তুকির চাপ সামাল দিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পথে হাঁটছে সরকার। এ লক্ষ্যে মূল্য সমন্বয়ের জন্য গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। একই সঙ্গে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন সরকারের জন্য একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), যেখানে উৎপাদন ব্যয়, বিক্রয় মূল্য, ভর্তুকি, ঘাটতি ও লোকসানের চিত্র তুলে ধরে দাম বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
পিডিবি সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ পড়ছে প্রায় ১২ টাকা, অথচ গড় বিক্রয় মূল্য সাত টাকার সামান্য বেশি। ফলে প্রতি ইউনিটে প্রায় পাঁচ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে সরকারকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৮ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার পরও লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছর শেষে মোট ঘাটতি ৫৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ঘাটতির একটি অংশ ভোক্তাদের ওপর চাপানোর চিন্তাভাবনা চলছে।
কর্মকর্তারা জানান, গ্রাহক পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা এবং পাইকারি পর্যায়ে ৫০ পয়সা থেকে ১ টাকা ২০ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে। তবে শূন্য থেকে ৭০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের জন্য বর্তমান দাম অপরিবর্তিত রাখার চিন্তা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভর্তুকির চাপ কমাতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ছাড়া সরকারের সামনে বিকল্প কম। তবে অতীতের অনিয়ম ও দুর্নীতির দায় সাধারণ জনগণের ওপর চাপানো উচিত নয় বলেও তারা মত দেন।
সম্প্রতি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা—বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির প্রভাব—বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে গত ৯ এপ্রিল বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা মূল্য সমন্বয় পর্যালোচনায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারাও রয়েছেন। তারা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে মন্ত্রিসভায় সুপারিশ দেবেন।
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ ছিল ১১.৮৩ টাকা, আর পাইকারি বিক্রয় মূল্য ছিল ৬.৯৯ টাকা—প্রতি ইউনিটে প্রায় ৬ টাকা লোকসান। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ গ্যাসনির্ভর হলেও কয়লা, ফার্নেস অয়েল, ডিজেল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও আমদানিকৃত বিদ্যুতের ওপরও নির্ভরতা রয়েছে, যেগুলোর ব্যয় তুলনামূলক বেশি।
বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের দায়িত্ব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-এর হলেও অতীতে নির্বাহী আদেশে দাম বাড়ানোর নজির রয়েছে। বর্তমানে সরকার আবারও দাম সমন্বয়ের বিষয়টি বিবেচনা করছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদ্যুতের দাম ৭ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হলে ভর্তুকির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম, অপচয় ও অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। তাই দাম বাড়ানোর আগে এসব খাত পর্যালোচনা ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তাদের মতে, প্রকৃত ঘাটতি নিরূপণ করে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর পরই মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
