পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও প্রতিবেশী তুরস্ক ও গ্রিসের মধ্যে সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ। এজিয়ান সাগর ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ, তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের অধিকার, সাইপ্রাস ইস্যু, উপকূলীয় নিয়ন্ত্রণ এবং দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব—এসব প্রশ্নে দুই দেশের বিরোধ গভীর হয়েছে। পাশাপাশি অভিবাসন সংকটও উত্তেজনা বাড়িয়েছে। গ্রিস দ্বীপগুলোর অবস্থানের ভিত্তিতে মহাদেশীয় তাক নির্ধারণের দাবি জানালেও তুরস্ক তা প্রত্যাখ্যান করে, কারণ এতে তাদের জ্বালানি অনুসন্ধানের পরিসর সীমিত হয়ে পড়বে।
এই বিরোধকে আরও জটিল করেছে লিবিয়ার সঙ্গে তুরস্কের সমুদ্রসীমা চুক্তি এবং বিতর্কিত এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম। সাইপ্রাস দ্বীপের বিভক্ত অবস্থাও দ্বন্দ্বকে তীব্র করেছে—এক অংশ তুরস্ক-ঘনিষ্ঠ, অন্য অংশ গ্রিসের প্রভাবাধীন। এসব প্রেক্ষাপটে আঙ্কারা-এথেন্স সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিরোধকে কাজে লাগিয়ে ইসরাইল গ্রিস ও গ্রিক সাইপ্রাসকে তুরস্কের বিরুদ্ধে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করছে।
গ্রিস ও গ্রিক সাইপ্রাসের সঙ্গে ইসরাইলের ঘনিষ্ঠতা মূলত পূর্ব ভূমধ্যসাগরে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার অংশ। ভৌগোলিকভাবে ছোট হলেও ইসরাইলের অধিকাংশ জনসংখ্যা ও শিল্প ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে কেন্দ্রীভূত। ফলে এ অঞ্চলটি তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বাফার জোন। পাশাপাশি বৈদেশিক বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতি এবং জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য সমুদ্রপথ উন্মুক্ত রাখা অপরিহার্য। লেভিয়াথান ও তামার গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের পর এই নির্ভরতা আরও বেড়েছে।
২০১০ সালে গাজামুখী ত্রাণবাহী জাহাজ ‘মাভি মারমারা’তে ইসরাইলি হামলার পর তুরস্ক-ইসরাইল সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এরপর তুরস্ক তাদের আকাশসীমা ইসরাইলি সামরিক বিমানের জন্য বন্ধ করে দিলে ইসরাইল বিকল্প হিসেবে গ্রিস ও গ্রিক সাইপ্রাসের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা জোরদার করে। এর ফলে ওই দুই দেশের আকাশসীমা ও ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইসরাইল বড় আকারের মহড়া, জ্বালানি ভরানো এবং দূরপাল্লার অভিযানের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।
তিন দেশ নিজেদের ‘পশ্চিমা ধাঁচের গণতান্ত্রিক’ ও ‘ভূমধ্যসাগরীয় ঐতিহ্যের ধারক’ হিসেবে উপস্থাপন করে একটি অভিন্ন পরিচয় গড়ে তুলছে, যা তুরস্কের বিপরীতে একটি ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। তাদের দৃষ্টিতে তুরস্কের আঞ্চলিক নীতি নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
ইসরাইলের লক্ষ্য দুইটি—তুরস্কের প্রভাব কমানো এবং নিজের আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতা কাটানো। গ্রিস ও গ্রিক সাইপ্রাস ইসরাইলকে সামরিক ও কৌশলগত সুবিধা দিচ্ছে, আর বিনিময়ে তারা পাচ্ছে প্রযুক্তি, অস্ত্র এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমর্থন। এই সহযোগিতা ইউরোপীয় ইউনিয়নেও ইসরাইলের অবস্থান শক্তিশালী করতে সহায়তা করছে।
তবে এই ঘনিষ্ঠতা ন্যাটোর অভ্যন্তরে বিভাজন তৈরি করছে বলেও সমালোচনা রয়েছে। জোটের সদস্য হয়েও গ্রিস ও গ্রিক সাইপ্রাস তুরস্কের বিরুদ্ধে ইসরাইলকে সহায়তা দেওয়ায় তা ন্যাটোর সম্মিলিত নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করা হচ্ছে।
এ প্রেক্ষাপটে গ্রিস ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ নামে একটি বহুস্তর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলছে, যা ইসরাইলের প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, যুদ্ধজাহাজসহ বিভিন্ন হুমকি মোকাবিলার পাশাপাশি এটি তুরস্কের সামরিক গতিবিধি পর্যবেক্ষণেও ভূমিকা রাখবে।
সব মিলিয়ে, গ্রিস ও গ্রিক সাইপ্রাসকে ঘিরে ইসরাইল একটি কৌশলগত পরিবেষ্টন তৈরি করছে, যার লক্ষ্য তুরস্ককে পূর্ব ভূমধ্যসাগরের নিরাপত্তা ও জ্বালানি সমীকরণ থেকে আংশিকভাবে বিচ্ছিন্ন রাখা। এই পরিস্থিতিতে তুরস্ক কী পদক্ষেপ নেয়, সেটিই এখন বিশ্লেষকদের নজরে।
সুত্রঃ ডেইলি সাবাহ
