বখতিয়ার খিলজি কর্তৃক নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসের প্রচলিত দাবিটিকে আধুনিক ইতিহাস গবেষক ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। ঐতিহাসিকদের মতে, ১২০৪ সালে বঙ্গ বিজয়ী এই মুসলিম সেনাপতির নালন্দা ধ্বংসের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই; এমনকি তিনি সেখানে যাননি বলেও প্রমাণ পাওয়া যায়।
আধুনিক ইতিহাস গবেষক ড. রাম পুনিয়ানির মতে, তৎকালীন ইতিহাসের প্রাথমিক কোনো সূত্রেই খিলজির নালন্দায় যাওয়ার উল্লেখ নেই। মিনহাজ-ই-সিরাজ রচিত ‘তবকাত-ই-নাসিরি’ এবং তিব্বতি পণ্ডিত ধর্মস্বামী ও তারানাথের বিবরণেও নালন্দা ধ্বংসের জন্য বখতিয়ারকে দায়ী করা হয়নি। বরং মিনহাজের বিবরণে ওদন্তপুরী নামক একটি সেনাশিবির বা দুর্গ আক্রমণের উল্লেখ রয়েছে, যা নালন্দা থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ছিল।
ঐতিহাসিকদের মতে, বখতিয়ার খিলজির আক্রমণের বহু আগেই নালন্দার পতন শুরু হয়েছিল। ডি. আর. পাটিলের ‘দ্য অ্যান্টিকোয়ারিয়ান রিমেইনস ইন বিহার’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, খিলজির বিহার আক্রমণের অন্তত ১০০ বছর আগে একাদশ শতকেই নালন্দার চূড়ান্ত ধ্বংস সম্পন্ন হয়েছিল। ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার এবং রমেশচন্দ্র মজুমদারও খিলজি কর্তৃক নালন্দা ধ্বংসের বিষয়টি সমর্থন করেননি।

তিব্বতি গ্রন্থ ‘পাগসাম ইয়ান জাং’ এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক রেফারেন্স অনুযায়ী, নালন্দা ধ্বংসের মূলে ছিল তৎকালীন ব্রাহ্মণ্যবাদ ও বৌদ্ধধর্মের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সংঘাত। তিব্বতি পণ্ডিত তারানাথের বর্ণনায় এসেছে, বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ সন্ন্যাসীদের মধ্যে বিবাদের জেরে ব্রাহ্মণদের অগ্নিসংযোগে নালন্দার বিশাল গ্রন্থাগার ‘রত্নোদধি’ ভস্মীভূত হয়েছিল। বি. এন. এস. যাদব এবং আর. কে. মুখার্জির মতো পণ্ডিতরাও এই মতকে সমর্থন করেছেন।
তিব্বতি সাধু ধর্মস্বামীর বিবরণ থেকে জানা যায়, বখতিয়ার খিলজির বিহার জয়ের ৩০ বছর পরও ১২৩৪ সালে নালন্দা মঠ সচল ছিল। সেখানে তখন মঠাধ্যক্ষ রাহুল শ্রীভদ্রের অধীনে ৭০ জন সাধু অধ্যয়ন করছিলেন। জোহান এলভার্সকগের মতে, ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত নালন্দা একটি কার্যকর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকে ছিল, যা বখতিয়ারের হাতে ধ্বংস হওয়ার দাবিকে ভিত্তিহীন প্রমাণ করে।
ঐতিহাসিকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নালন্দা ধ্বংসের দায় বখতিয়ার খিলজির ওপর চাপানো মূলত একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার। ষষ্ঠ শতকের রাজা মিহিরকুল এবং পরবর্তী সময়ে বিজয় সেনের মতো শাসকদের আক্রমণও নালন্দার পতনে ভূমিকা রেখেছিল বলে লিপিতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণে উঠে এসেছে। সব মিলিয়ে, তথ্য-উপাত্ত বলছে বখতিয়ার খিলজি ও নালন্দা ধ্বংসের কাহিনিটি ঐতিহাসিকভাবে সত্য নয়।
তথ্যসূত্র: ফ্রম মুসলিমস্







