একটি বিষয় দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে, স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর পুনর্বাসন ঘটেছিল মূলত বিএনপির হাত ধরেই। একাত্তরে দলটির ভূমিকা নিয়ে বিএনপি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তুলনামূলকভাবে সহনশীল অবস্থানে ছিল। দুই দল একসঙ্গে জোট বেঁধে রাজনীতি করেছে, এটাও খুব পুরোনো ঘটনা নয়।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে জামায়াতের সীমিত হলেও গুরুত্বপূর্ণ ভোটব্যাংক বিএনপির জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। ফলে ওই সময় বিএনপির ভেতরে জামায়াতকে ঘিরে সমালোচনা অনেকটাই চাপা ছিল। তবে এখন পরিস্থিতি বদলেছে; দুই দলের সম্পর্কেও নতুন মেরুকরণ দেখা যাচ্ছে। সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ অধিবেশনে দুই পক্ষের বাগ্বিতণ্ডা সেই পরিবর্তিত রসায়নকে আরও স্পষ্ট করেছে।
রাজনীতির এক অদ্ভুত বাস্তবতায় আজ বিএনপি ক্ষমতায়, আর জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী দল। অথচ নির্বাচন সামনে রেখে জোটবদ্ধ হওয়ার এবং ক্ষমতা ভাগাভাগির সুযোগ ছিল উভয়েরই। বিএনপি শুরু থেকেই আওয়ামী লীগবিরোধী দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন করতে আগ্রহী ছিল, এবং কয়েকটি ছোট দল সেই প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে এখন সরকারেও অংশ নিয়েছে।
কিন্তু জামায়াত দুই কারণে সে পথে হাঁটেনি। প্রথমত, তারা এককভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিজেদের শক্তি যাচাই করতে চেয়েছিল। ছাত্র রাজনীতিতে শিবিরের সাফল্য তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছিল। দ্বিতীয়ত, তারা বুঝেছিল—সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও প্রধান বিরোধী দল হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল, যা কিছু মন্ত্রিত্বের চেয়েও বেশি প্রভাব ও মর্যাদা দিতে পারে। উপরন্তু, বিরোধী দলের জন্য নির্ধারিত সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধাগুলিও তাদের এই সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখে।
জামায়াতের এই কৌশল আপাতত ফলপ্রসূ হয়েছে। তারা নিজস্ব রাজনৈতিক বলয় গড়ে তুলতে পেরেছে এবং সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দলের অবস্থান নিয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন নিরবচ্ছিন্ন ও দৃশ্যমান উপস্থিতি তাদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা। তবে এই অবস্থান কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপ্রবাহের ওপর।
নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্ক জটিল ও বহুমাত্রিক। কখনো তা সহযোগিতামূলক মনে হয়, আবার কখনো নীতিগত বিরোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সংস্কার ইস্যুতে জামায়াত সমালোচনামুখর হলেও তাদের কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে সীমিত পর্যায়ে থাকে। একইভাবে, মাঠপর্যায়ে জামায়াতের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়েও বিএনপির প্রতিক্রিয়া তুলনামূলক সংযত।
তবে একটি বিষয়ে দুই দলের মধ্যে সমন্বয় স্পষ্ট, স্থানীয় সরকার ও বিভিন্ন পেশাজীবী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ প্রার্থীদের বাইরে রাখা। এর পেছনে রয়েছে একটি বাস্তব হিসাব: যতদিন আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে পূর্ণাঙ্গভাবে ফিরে না আসে, ততদিন বিএনপি ও জামায়াত উভয়ের জন্যই রাজনৈতিক সুযোগ তুলনামূলক বেশি থাকবে।
বিএনপির জন্য এর অর্থ, দৃঢ় বিরোধিতা ছাড়াই সরকার পরিচালনা এবং নির্বাচনে তুলনামূলক সুবিধা। অন্যদিকে, জামায়াতের জন্য প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বর্তমান মর্যাদা ধরে রাখা সহজ হয়। তবে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে ফিরে এলে এই সমীকরণ বদলে যেতে পারে, এবং জামায়াতের অবস্থানও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
দুই দলের সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিক হলো একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা, যাকে অনেকেই ‘একাত্তর কার্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেন। বিএনপির ভেতরেই এ বিষয়ে দুটি ধারা রয়েছে। একদিকে মুক্তিযোদ্ধা-ঘনিষ্ঠ অংশ, যারা সুযোগ পেলেই জামায়াতের অতীত ভূমিকার সমালোচনা করেন। অন্যদিকে, একটি বাস্তববাদী অংশ আছে, যারা রাজনৈতিক প্রয়োজনে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার পক্ষে এবং অতীত ইস্যু সামনে আনার ক্ষেত্রে সংযত।
সাম্প্রতিক সংসদ অধিবেশনে এই ‘গুড কপ–ব্যাড কপ’ কৌশল স্পষ্ট হয়েছে। কেউ কেউ কঠোর সমালোচনা করেছেন, আবার অন্যরা তা প্রশমিত করার চেষ্টা করেছেন। এতে বোঝা যায়, বিএনপি এখনো জামায়াতকে ঘিরে একটি ভারসাম্য রক্ষা করার কৌশল অনুসরণ করছে, যেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী অতীতকে সামনে আনা হয়, আবার প্রয়োজনে তা আড়ালেও রাখা হয়।
