ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে লাখ লাখ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে সীমান্তঘেঁষা মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলায় এই প্রক্রিয়াটি এমন এক মানবিক বিপর্যয় তৈরি করেছে, যা অনেক বিশ্লেষকের মতে ওই অঞ্চলে ‘আরেক কাশ্মীর’ সৃষ্টির পূর্বাভাস দিচ্ছে। ভারতের নির্বাচন কমিশনের ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজ্যটির প্রায় ৯২ লাখ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রায় ৬০ শতাংশই মুসলিম। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কোনো পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে ভারতে বসবাস করলেও এবং সমস্ত বৈধ নথি থাকা সত্ত্বেও তাদের নাম তালিকা থেকে গায়েব করে দেওয়া হয়েছে। মুর্শিদাবাদের সরকারি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলামের মতো উচ্চপদস্থ ব্যক্তি থেকে শুরু করে কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি পর্যন্ত এই বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। বিশেষ করে নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুরের মতো হাই-প্রোফাইল আসনগুলোতে মুসলিম ভোটারদের বাদ দেওয়ার হার অস্বাভাবিকভাবে বেশি।
এই প্রশাসনিক তৎপরতার পাশাপাশি মালদহ ও মুর্শিদাবাদে মুসলিমদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও হয়রানি বেড়েছে। সীমান্ত জেলা হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার অধিকার হরণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে ‘জঙ্গি’ তকমা দিয়ে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নিয়মিত হয়রানি এবং বিএসএফ-এর কড়াকড়ি স্থানীয়দের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। অনেককে এমনকি ভিটেমাটি বিক্রি করে বাংলাদেশে চলে যাওয়ার জন্য হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও খবর পাওয়া গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বর্জনের আড়ালে রয়েছে সুচতুর ‘ইলেকটোরাল ইঞ্জিনিয়ারিং’। যেহেতু মুসলিম ভোট সাধারণত বিজেপি-বিরোধী বাক্সে যায়, তাই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে গাণিতিক সুবিধা পেতে পরিকল্পিতভাবে এই ভোটার ছাঁটাই করা হয়েছে। এমনকি ২০১৫ সালের ছিটমহল বিনিময় চুক্তির পর ভারতকে বেছে নেওয়া মুসলিম অধিবাসীরাও আজ রাষ্ট্রহীন হওয়ার শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। এই প্রক্রিয়াটি অনেকটা মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নিধনের শুরুর দিকের পদ্ধতির সঙ্গে মিলে যাচ্ছে বলে মানবাধিকার কর্মীরা মনে করছেন।
এই সংকটের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে ‘পুশ-ইন’ বা বাংলাদেশে জোরপূর্বক পুশব্যাকের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিএসএফ-এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে কয়েক হাজার মানুষকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে সীমান্তে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে নাগরিকত্বহীন করে সীমান্তমুখী করা বাংলাদেশের জন্য যেমন নিরাপত্তার হুমকি, তেমনি এটি দক্ষিণ এশিয়ার অস্থিতিশীলতার নতুন কারণ হয়ে উঠতে পারে। ভারতের অভ্যন্তরীণ এই রাজনৈতিক কৌশল এখন একটি আঞ্চলিক সংকটের রূপ নিচ্ছে।
