২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি ঢাকার হোটেল র্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেনে এক নজিরবিহীন নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির নিয়ন্ত্রণ নেয় এস আলম গ্রুপ। প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তাদের তদারকিতে অনুষ্ঠিত সেই পরিচালনা পর্ষদ সভায় ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান মুস্তাফা আনোয়ার, ভাইস চেয়ারম্যান এম আজিজুল হক এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মান্নানকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। এই ঘটনাটি বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে একটি কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে পরিচিত।
সংশ্লিষ্টদের বয়ান অনুযায়ী, সভার দিন সকালে ওই তিন শীর্ষ ব্যক্তিকে ডিজিএফআই কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে সাদা কাগজে পদত্যাগপত্রে সই করানো হয়। র্যাডিসনের সভায় হঠাৎ করেই প্রবেশ করেন ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক মোহাম্মদ আকবর হোসেন এবং এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ। অপরিচিত ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে পর্ষদ সদস্যদের মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং আতঙ্কিত পরিবেশে মালিকানা হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়।
সভায় নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত করা হয় পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক সদস্য আরাস্তু খানকে, যিনি এস আলম গ্রুপের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান আরমাডা স্পিনিং মিলের প্রতিনিধি ছিলেন। একই সভায় এস আলমের নির্দেশে দ্রুততম সময়ে নতুন পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়। পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার সময় বিদায়ী চেয়ারম্যান মুস্তাফা আনোয়ারের চোখ ছলছল করছিল এবং এমডি আবদুল মান্নানকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গোয়েন্দা কার্যালয়ে আটকে রাখা হয়েছিল।
এই মালিকানা পরিবর্তনের নথিপত্র ওই রাতেই তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরের কর্মদিবসেই তা অনুমোদিত হয়। অভিযোগ রয়েছে, এস আলম গ্রুপকে নিয়মবহির্ভূত ঋণ সুবিধা দিতেই এই দখল প্রক্রিয়া চালানো হয়েছিল। এর আগে এস আলম গ্রুপ বিভিন্ন বেনামি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যাংকের শেয়ার কিনে নেয়, যার ফলে দীর্ঘদিনের বিদেশি ও স্থানীয় উদ্যোক্তারা তাঁদের শেয়ার ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
সম্প্রতি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে এই ব্যাংক দখলের নেপথ্যের গল্পগুলো সামনে আসতে শুরু করে। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের এস আলম নিয়ন্ত্রিত শেয়ারগুলো জব্দ করা হয়েছে এবং ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিযুক্ত স্বতন্ত্র পরিচালকদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। সাবেক এমডি আবদুল মান্নানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এখন মুখ খুলছেন এবং সেই ভয়াবহ জবরদস্তির শিকার হওয়ার কথা প্রকাশ্যে বলছেন।
