দেশের আলোচিত ইসলামি সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ নানা ইস্যুতে কার্যত বিভক্ত অবস্থায় রয়েছে। কওমি মাদরাসাভিত্তিক এ অরাজনৈতিক সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে অনেকটাই স্থবির। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যাপক দমন-পীড়নের শিকার হওয়া সংগঠনটির নেতারা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও আগের মতো ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে ফিরতে পারেননি।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে সংগঠনটির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে যে দূরত্ব ও মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। যদিও বিভাজন নিরসনে বিভিন্ন পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তবু এর সফলতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন রয়েছে। তবে হেফাজতের একাধিক নেতা দাবি করছেন, সব মতপার্থক্য দূর করে ১৩ দফাসহ বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনে তারা আবারও ঐক্যবদ্ধ হবেন।
সম্প্রতি সংগঠনের শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর অভিযোগে ভোলা জেলা শাখার সহ-সাধারণ সম্পাদক মাওলানা রাকিবুল ইসলাম ফারুকীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। রাজধানীর একটি মাদরাসায় অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় ও মহানগর নেতাদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একইসঙ্গে বিভাজন নিরসনে গঠিত সাব-কমিটিও বিভিন্ন পক্ষের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে কওমি মাদরাসার আলেমদের উদ্যোগে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ ঘটে। চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফী-এর নেতৃত্বে সংগঠনটি দ্রুত দেশজুড়ে আলোচনায় আসে। বিশেষ করে শাহবাগ আন্দোলনের পাল্টা কর্মসূচি হিসেবে ১৩ দফা দাবিতে শাপলা চত্বরে সমাবেশ জাতীয় রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে।
২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পর সংগঠনটি বড় ধরনের সংকটে পড়ে। বহু নেতাকর্মী নিহত ও আহত হন। এরপর সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও দমন-পীড়ন চলতে থাকে। একই সময়ে সরকারপক্ষ থেকে হেফাজতের নেতাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়া কিংবা রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার নানা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে দাবি করা হয়।
২০১৮ সালে কওমি সনদের স্বীকৃতি উপলক্ষে আয়োজিত এক সমাবেশে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-কে ‘কওমি জননী’ উপাধি দেওয়ার ঘটনায় সংগঠনের ভেতরে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। পরে এই অসন্তোষ হাটহাজারী মাদরাসাকেন্দ্রিক আন্দোলনে রূপ নেয়।
২০২০ সালে আল্লামা শাহ আহমদ শফী-এর মৃত্যুর পর সংগঠনে নতুন নেতৃত্ব এলেও স্থিতিশীলতা আসেনি। জুনায়েদ বাবুনগরী আমির নির্বাচিত হলেও পরবর্তী সময়ে মোদিবিরোধী আন্দোলন ঘিরে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়। পুলিশের অভিযানের মুখে সংগঠনের কমিটি বিলুপ্ত করা হয় এবং পরে নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। এরপরও একের পর এক গ্রেপ্তার ও দমন-পীড়নের কারণে সংগঠনকে কার্যকরভাবে সংগঠিত করা সম্ভব হয়নি।
জুনায়েদ বাবুনগরীর মৃত্যুর পর মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী আমির নির্বাচিত হন। পরে মহাসচিব নুরুল ইসলাম জিহাদীর মৃত্যুর পর দায়িত্ব পান সাজিদুর রহমান। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংগঠনের ভেতরে রাজনৈতিক বিভাজন আরও স্পষ্ট হতে থাকে।
সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হেফাজতের নেতারা বিভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানে বিভক্ত হয়ে পড়েন। কেউ বিএনপি-সমর্থিত জোটের পক্ষে সক্রিয় ছিলেন, আবার কেউ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে যুক্ত হন। অন্যদিকে সংগঠনের আরেকটি অংশ নির্বাচনি রাজনীতি থেকে দূরে থাকার পক্ষে অবস্থান নেয়। ফলে কেন্দ্রীয়ভাবে কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে।
বর্তমানে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় ব্যানারে বড় কোনো কর্মসূচি দেখা যাচ্ছে না। এমনকি শাপলা চত্বরের ঘটনাকে ঘিরেও কেন্দ্রীয়ভাবে উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি পালিত হয়নি। তবে নেতারা বলছেন, বিভাজন কাটিয়ে আবারও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা চলছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের বাবুনগরে হেফাজতের আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী-এর সঙ্গে সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে ঐক্য প্রতিষ্ঠা ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ফেরানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে নির্বাচনকেন্দ্রিক বিভাজন নিরসনে সাব-কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।
হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল, তা সমাধানে কাজ চলছে এবং পরিস্থিতি ইতিবাচক দিকে যাচ্ছে। তিনি জানান, হজ মৌসুম শেষ হলে সংগঠনের স্বাভাবিক কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।
সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশির উল্লাহ বলেন, কিছু নেতার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তবে হেফাজতের ধর্মীয় ও আদর্শিক ঐক্য অটুট রাখতে সবাই একমত হয়েছেন।
হেফাজতের নায়েবে আমির মুহিউদ্দীন রাব্বানী বলেন, রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও ১৩ দফা ও ইসলামি বিভিন্ন ইস্যুতে সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকবেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পবিত্র হজের পর সংগঠনটি আবারও সক্রিয় ও সুসংগঠিতভাবে মাঠে ফিরবে।
বর্তমানে হেফাজতের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—আওয়ামী লীগ আমলের মামলাগুলো প্রত্যাহার, কওমি আলেমদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ, শাপলা চত্বরের ঘটনার বিচার এবং আগের ১৩ দফা দাবির বাস্তবায়ন।
