সরকারের অভ্যন্তরে মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ ও বড় ধরনের রদবদল নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। বর্তমান ৫০ সদস্যের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আরও সাত থেকে আটজন নতুন মুখ যুক্ত হতে পারেন বলে জানা গেছে। তবে বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা ৬০ ছাড়াতে পারে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর কার্যক্রমে অসন্তোষ রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। এ কারণে অভিজ্ঞ ও তরুণ নেতৃত্বের সমন্বয়ে মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। নতুন এই রদবদলে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এমনকি উপমন্ত্রীর পদও থাকতে পারে। সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছেন প্রবীণ সংসদ সদস্য, কয়েকজন নারী এমপি এবং যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলের প্রতিনিধিরা। পাশাপাশি টেকনোক্র্যাট কোটায় একজনকে অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। নতুন দুজন উপদেষ্টা নিয়োগের বিষয়েও আলোচনা চলছে।
সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আনা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যদিও মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের নির্দিষ্ট সময় এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তবে খুব শিগগিরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জনগণের সেবার মান উন্নয়নকেও এই পরিকল্পনার অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা অনুযায়ী মন্ত্রিসভার আকার আরও বাড়তে পারে এবং কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসও হতে পারে। তার ভাষায়, “খুব দ্রুতই এ বিষয়ে ঘোষণা আসতে পারে।”
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, “মন্ত্রিসভা গঠন ও রদবদল পুরোপুরি প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার। তিনি যাকে প্রয়োজন মনে করবেন, তাকেই দায়িত্ব দেবেন।”
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সম্ভাব্য কয়েকজনের বিষয়ে ফাইল প্রস্তুতের কাজ চলছে। তবে কবে নতুন মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের নাম ঘোষণা করা হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত নির্দেশনা আসেনি। তার মতে, কিছু মন্ত্রণালয়ে অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকায় নতুন মুখ যুক্ত করে সরকার পরিচালনাকে আরও কার্যকর করার চিন্তা করা হচ্ছে। প্রয়োজনে কাউকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রীও করা হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়েছে। গত ৪ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর দুই উপদেষ্টাকে গুরুত্বপূর্ণ দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং আট প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস করা হয়। এসব পদক্ষেপকে বড় ধরনের পুনর্গঠনের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে দেখছেন তারা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর অধীনে একাধিক মন্ত্রণালয় থাকায় তারা কাজের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে প্রশাসনিক গতি বাড়াতে এবং জনসেবা আরও কার্যকর করতে মন্ত্রিসভার পরিধি বাড়ানোর বিষয়টি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হতে পারে।
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর বাইরে মন্ত্রিসভায় রয়েছেন ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী। উপমন্ত্রীর কোনো পদ নেই। বিএনপি সরকারের ২০০১ সালের মন্ত্রিসভায় ২৮ জন মন্ত্রী, ২৮ জন প্রতিমন্ত্রী ও চারজন উপমন্ত্রী ছিলেন। প্রথম দফায় সে সময় ৪৬ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন হলেও পরে তা বেড়ে ৬০ জনে পৌঁছায়।
মন্ত্রিসভা রদবদল প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্রে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন বা নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত হওয়া স্বাভাবিক বিষয়। তবে কখন এবং কীভাবে তা হবে, সেটি একমাত্র প্রধানমন্ত্রীই জানেন।
আলোচনায় যেসব মন্ত্রণালয়
সরকার ও দলীয় সূত্রগুলো জানায়, গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে এখনো আলাদা মন্ত্রী নেই। অর্থ ও পরিকল্পনা, নারী ও শিশুবিষয়ক ও সমাজকল্যাণ, বাণিজ্য-শিল্প-বস্ত্র ও পাট, শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণ, কৃষি-মৎস্য-খাদ্য, শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, সড়ক পরিবহন-রেলপথ-নৌপরিবহন—এমন একাধিক মন্ত্রণালয় বর্তমানে একই ব্যক্তির অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে এসব খাতে আলাদা দায়িত্ব বণ্টনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
সম্ভাব্য নতুন মুখ
দলীয় সূত্র অনুযায়ী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও বেগম সেলিমা রহমানকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে দেখা যেতে পারে। ২০০১ সালের মন্ত্রিসভাতেও তারা দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
এছাড়া সম্ভাব্য নতুন সদস্যদের তালিকায় রয়েছেন বরকত উল্লাহ বুলু, নজরুল ইসলাম আজাদ, প্রকৌশলী আশরাফ উদ্দিন বকুল, অধ্যাপক ডা. মো. আনোয়ারুল হক, আলী আজগর লবি, সেলিমুজ্জামান সেলিম এবং শহীদুল ইসলাম বাবুল।
শরিকদের মূল্যায়নের সম্ভাবনা
যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোকেও সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি ছিল বিএনপির। ইতোমধ্যে গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর, এনডিএমের ববি হাজ্জাজ ও গণতন্ত্র মঞ্চের জোনায়েদ সাকিকে প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে। তবে আরও কয়েকজন শরিক নেতাকে মন্ত্রিসভায় যুক্ত করার বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।
টেকনোক্র্যাট কোটায় যাদের নাম
টেকনোক্র্যাট কোটায় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে। এছাড়া শামসুজ্জামান দুদু, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং ডা. মওদুদ আহমেদ পাভেলের নামও আলোচনায় এসেছে।
