দরিদ্র, শ্রমিক ও কৃষকের অধিকার রক্ষার রাজনীতি করার দাবি বাম দলগুলোর দীর্ঘদিনের। কিন্তু সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফল বলছে, যাদের প্রতিনিধিত্বের কথা তারা বলে, সেই শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছেও তারা আর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পারছে না। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বামপন্থী জোটের সব প্রার্থীই জামানত হারিয়েছেন।
নির্বাচনকে সামনে রেখে বাম ধারার নয়টি দল মিলে ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ গঠন করেছিল। একসময় চীনপন্থী ও রুশপন্থী হিসেবে পরিচিত প্রায় সব ধারার বাম দলই এতে যুক্ত হয়। তবে জোট গড়লেও অনেক আসনে একক প্রার্থী দিতে পারেনি তারা। যেমন কিশোরগঞ্জ-১ আসনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ও বাসদ (মার্ক্সবাদী) আলাদা প্রার্থী দেয়। অথচ কেউই এক হাজার ভোটের সীমা অতিক্রম করতে পারেননি।
জোটের সবচেয়ে আলোচিত প্রার্থী ছিলেন মনীষা চক্রবর্তী। বরিশাল-৫ আসনে তিনি ২২ হাজার ৪৮৬ ভোট পান, যা বামপন্থী জোটের জন্য তুলনামূলক ভালো ফল হিসেবে বিবেচিত হয়। তবু তাঁরও জামানত রক্ষা হয়নি। অন্যদিকে সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন নরসিংদী-৪ আসনে পান মাত্র ৮৩৯ ভোট এবং সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ হিল ক্বাফী কুমিল্লা-৫ আসনে পান ৩৪২ ভোট।
বাম দলগুলোর রাজনৈতিক বক্তব্যের কেন্দ্রে থাকে শ্রমিক, কৃষক ও দরিদ্র মানুষের কথা। কিন্তু বাস্তবে শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকা, কৃষিনির্ভর জনপদ কিংবা অপেক্ষাকৃত দরিদ্র অঞ্চল—কোথাও তারা শক্তিশালী ভোটভিত্তি গড়ে তুলতে পারেনি। শহুরে মধ্যবিত্তের কাছেও তাদের আবেদন সীমিত হয়ে পড়েছে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে মধ্যপন্থী শক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিই প্রধান ধারায় পরিণত হয়েছে। একসময় বাম দলগুলো এই দুই ধারার মধ্যে ভারসাম্য তৈরিতে ভূমিকা রাখলেও সময়ের সঙ্গে সেই প্রভাব কমেছে। বরং ভোটের রাজনীতিতে ইসলামপন্থী দলগুলো ধীরে ধীরে বামদের জায়গা দখল করেছে। জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিস কিংবা জমিয়তের মতো দলগুলো এখন অনেক বেশি সংগঠিত ও দৃশ্যমান।
নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের সময় বাম দলগুলোর রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল স্পষ্ট। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও তারা ভূমিকা রাখত। কিন্তু বর্তমানে তাদের কার্যক্রম অনেকটাই সীমাবদ্ধ আলোচনা সভা, ছোটখাটো মিছিল বা প্রেসক্লাবকেন্দ্রিক কর্মসূচিতে। ফলে ভোটের মাঠ ও জাতীয় রাজনীতি—দুই জায়গাতেই বামপন্থীরা অনেকটা প্রান্তিক হয়ে পড়েছে।
বাম রাজনীতির আরেকটি বড় সংকট হলো বিভক্তি। মতাদর্শিক বিরোধ, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে একের পর এক ভাঙনের শিকার হয়েছে দলগুলো। ফলে একই আদর্শের একাধিক দল নামের শেষে বিভিন্ন ব্র্যাকেট যোগ করে আলাদা পরিচয়ে রাজনীতি করছে। এতে জনমনে বিভ্রান্তি যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনি সাংগঠনিক শক্তিও দুর্বল হয়েছে।
একসময় যেসব এলাকায় বাম রাজনীতির শক্ত ঘাঁটি ছিল, সেখানেও এখন তাদের প্রভাব কমে গেছে। পঞ্চগড়, নেত্রকোনা কিংবা কুমিল্লার মতো এলাকায় সিপিবি বা ন্যাপের ঐতিহাসিক উপস্থিতি থাকলেও ভোটের হিসাবে তা আর দৃশ্যমান নয়। বরং সেই জায়গাগুলোতে বিএনপি, আওয়ামী লীগ বা ইসলামপন্থী দলগুলো শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
বাম রাজনীতির পরিচিত মুখ রাশেদ খান মেনন ও হাসানুল হক ইনু-রাও নিজেদের প্রতীকে ধারাবাহিক সাফল্য পাননি। পরে তাঁরা আওয়ামী লীগের জোটে গিয়ে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত হয় জোনায়েদ সাকি ও সাইফুল হক-এর মতো নেতাদের দল। অর্থাৎ বামপন্থী দলগুলোর বড় অংশই শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ বা বিএনপির ছায়াতেই অবস্থান নিয়েছে।
বাসদের প্রধান উপদেষ্টা খালেকুজ্জামান মনে করেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা বামপন্থীদের অনুকূলে নয়। তাঁর মতে, বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদ ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের উত্থানের কারণে বাম রাজনীতি সংকটে পড়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, বাম দলগুলোর মধ্যেও কৌশল, পরিকল্পনা ও ঐক্যের ঘাটতি রয়েছে।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদর মতে, ১৯৫৪ সালের পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে কমিউনিস্টদের প্রভাব ধীরে ধীরে কমতে থাকে। জনগণের সঙ্গে তাদের সংযোগ দুর্বল হয়ে গেছে এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার মতো বাস্তবধর্মী রাজনৈতিক কৌশলও তারা গড়ে তুলতে পারেনি। তাঁর ভাষায়, বাম দলগুলো এখন বড়জোর আওয়ামী লীগ বা বিএনপির মতো বড় দলের সহযোগী শক্তি হিসেবেই সীমিত প্রভাব ধরে রাখতে পারছে।
