কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার বাসিন্দা হারুন (৫২) দীর্ঘ প্রায় ৩৯ বছর পর ভারতের গুজরাট থেকে সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করার সময় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) হাতে আটক হয়েছেন। তিনি ১৯৮৭ সালে জীবিকার তাগিদে ভারতে গিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে সেখানকার স্থায়ী নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট গ্রহণ করেন। সম্প্রতি ভারতে মুসলমানদের ওপর চলমান সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও হামলার ঘটনায় চরম আতঙ্কিত হয়ে তিনি নিজ জন্মভূমিতে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন বলে জানিয়েছেন।
আটকের পর বিজিবি সদস্যরা হারুনকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় সোপর্দ করে। থানায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও পরিচয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই শেষে আইনি প্রক্রিয়া মেনে তাঁকে তাঁর পরিবারের জিম্মায় হস্তান্তর করা হয়। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুল ইসলাম এই তথ্য নিশ্চিত করে জানান, হারুন মূলত আমাদের দেশেরই সন্তান। তবে ভবিষ্যতে যেন বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসা ছাড়া এভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম না করেন, সে বিষয়ে তাঁকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে।
থানায় অবস্থানকালে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে হারুন ভারতের বিভিন্ন এলাকায় মুসলমানদের ওপর বর্তমান সময়ে ঘটে চলা ভয়ভীতি, মানসিক নির্যাতন ও সঙ্ঘবদ্ধ হামলার এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভ ও দুঃখের সাথে জানান, ভারতে বর্তমানে মুসলমানদের ওপর যে ধরনের পরিকল্পিত নির্যাতন ও নিপীড়ন চলছে, তার প্রকৃত চিত্র সেখানকার মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে একেবারেই উঠে আসে না। অনেক মিডিয়া ভয়ে বা চাপে এসব স্পর্শকাতর ঘটনা এড়িয়ে যায় এবং কেবল ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর একপাক্ষিক বক্তব্যই প্রচার করে। আল্লাহকে সাক্ষী রেখে তিনি দাবি করেন, সেখানকার সাধারণ মুসলিম নাগরিকরা প্রতিনিয়ত চরম কষ্ট ও জীবননাশের আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
হারুন আরও গুরুতর অভিযোগ করে বলেন, ভারতের কলকাতাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মুসলিমদের জোরপূর্বক ধর্মীয় স্লোগান দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। কেউ এতে অস্বীকৃতি জানালে বা নিজের ধর্মীয় স্বাধীনতায় অনড় থাকলে তাঁদের ওপর বর্বর শারীরিক হামলা ও মারধর করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী মসজিদ ও মাদরাসায় উগ্রপন্থীদের হামলা এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনাও প্রতিনিয়ত ঘটছে বলে তিনি নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে দাবি করেন। তিনি নিজে দ্বৈত নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেখানে থাকা আর কোনোভাবেই নিরাপদ মনে করেননি।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনেও ভারতের গুজরাট, দিল্লি, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিম নাগরিকদের মসজিদ, ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার খবর বিভিন্ন সময় শিরোনাম হয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেখানে নতুন করে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যার ফলে বাংলাদেশ সীমান্তে পুশইন বা অবৈধ অনুপ্রবেশের ঝুঁকিও আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) ক্যাম্পে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
