তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি-সমর্থিত নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিন পার হয়েছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে। রাজনৈতিক মেরুকরণ, অর্থনৈতিক সংকট, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং সামাজিক বিভাজনের প্রেক্ষাপটে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। শুরু থেকেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপের মুখে পড়ে সরকার।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্প সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সফলতা-ব্যর্থতা মূল্যায়ন করা না গেলেও এই সময়কাল ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনীতি: বড় চ্যালেঞ্জের মুখে সরকার
প্রথম ১০০ দিনে সবচেয়ে বড় চাপ ছিল অর্থনীতি পুনর্গঠন। ব্যাংক খাতের সংস্কার, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখাই ছিল প্রধান অগ্রাধিকার। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও মূল্যস্ফীতির চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সময়কাল মূলত “ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট” পর্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদিও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে কিছু পদক্ষেপ প্রশংসা পেয়েছে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এখনও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি।
অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজেট ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার দিকেই সরকারের আসল নীতি স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, মন্ত্রিসভার ৬০টি সিদ্ধান্তের মধ্যে প্রায় ৬২ শতাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
ব্যাংকিং ও কাঠামোগত সংস্কার
ব্যাংক খাতের অস্থিরতা, খেলাপি ঋণ এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরি করেছে। নীতিনির্ধারকদের মতে, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হবে।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ রয়ে গেছে। ধর্ষণ, হত্যা ও ছিনতাইয়ের ঘটনা এখনও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বোধে প্রভাব ফেলছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, পুলিশ ও প্রশাসনের কার্যকারিতা প্রত্যাশা অনুযায়ী উন্নত হয়নি। কিছু এলাকায় মব ভায়োলেন্স এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা লক্ষ্য করা গেছে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, পরিস্থিতি উন্নয়নে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরছে।
রাজনৈতিক বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার প্রথম ১০০ দিনে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে আলোচনার পরিবেশ বজায় রাখতে পেরেছে, যা একটি ইতিবাচক দিক।
তবে সংসদীয় কার্যক্রম, সংবিধান সংস্কার এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক এখনও অব্যাহত রয়েছে। বিরোধী দল ভবিষ্যতে আন্দোলনের ইঙ্গিত দিয়েছে বলেও জানা গেছে।
সরকারের দাবি
সরকারের দাবি অনুযায়ী, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তারা কাজ করছে। কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ডসহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন ও পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
সরকারি মুখপাত্রের মতে, উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রম গতিশীল করতে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
সার্বিক মূল্যায়ন
বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম ১০০ দিনকে পূর্ণাঙ্গ সাফল্য বা ব্যর্থতার মানদণ্ডে বিচার করা না গেলেও এটি সরকারের ভবিষ্যৎ সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা—এই তিনটি খাতই আগামী দিনে সরকারের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে থাকবে।
