চলতি সপ্তাহের শুরুতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যাধুনিক ‘এমকিউ-৯ রিপার’ গোয়েন্দা ড্রোন সফলভাবে ভূপাতিত করার দাবি করেছে ইরান। তেহরান জানায়, এই হাই-প্রোফাইল অভিযানে তারা সম্পূর্ণ নতুন প্রযুক্তির একটি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করেছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, মাসের পর মাস ধরে ধারাবাহিক মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু হওয়ার পরও ইরান যে এখনো শক্তিশালী পাল্টা আঘাত হানার সামরিক সক্ষমতা ধরে রেখেছে, এই ঘটনা তারই বড় প্রমাণ।
ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেশম দ্বীপের কাছে মার্কিন ড্রোনটি আকাশেই ধ্বংস করে নামানো হয়। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ‘আরাশ-ই কামানগির’ নামক এই বিশেষ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাটি এই প্রথম কোনো বাস্তব যুদ্ধে ব্যবহার করল মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটি। সম্প্রতি বন্দর আব্বাসের কাছে একটি ইরানি সামরিক ঘাঁটিতে নতুন করে মার্কিন বিমান হামলার পরপরই বিশ্বের অন্যতম সংবেদনশীল এই নৌপথে আলোচিত মার্কিন ড্রোনটি ভূপাতিত করার ঘটনা ঘটল। এর পাল্টা জবাবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) একটি ‘মার্কিন বিমানঘাঁটিতে’ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবিও করেছে।
বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চললেও এই ড্রোন ভূপাতিত করার ঘটনা তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধ উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে। মাসের পর মাস চলা ইসরায়েলি ও মার্কিন আগ্রাসনের পর ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আর কতটুকু অবশিষ্ট আছে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক স্তরে চুলচেরা বিশ্লেষণ। বিশেষ করে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা ব্যর্থ হলে ইরান আমেরিকার নতুন কোনো বড় আক্রমণ সামলাতে পারবে কি না, সেটিই এখন বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা ফারস নিউজ জানায়, হরমুজ প্রণালিতে একটি ‘শত্রু’ গোয়েন্দা ড্রোন ঠেকাতে এই ‘আরাশ-ই কামানগির’ ব্যবস্থা সফলভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এই অত্যাধুনিক ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—এটি যেকোনো রাডার ফাঁকি দেওয়া স্টিলথ প্রযুক্তির যুদ্ধবিমান বা ড্রোন অনায়াসে শনাক্ত করতে সক্ষম। ইরানি গণমাধ্যমের দাবি, এটি আকাশ ও জলসীমায় অবস্থান করা শত্রু বিমানের জন্য একটি চূড়ান্ত সতর্কবার্তা। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি আলোচনায় হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণকে ‘তুরুপের তাস’ হিসেবে ব্যবহার করতে চায় তেহরান।
নতুন এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ফারসি অর্থ হলো ‘তিরন্দাজ আরাশ’, যা পারস্যের পৌরাণিক এক বীরের নামানুসারে রাখা হয়েছে। লোকগাথা অনুযায়ী, তিনি একটি তির ছুঁড়ে প্রাচীন ইরান ও মধ্য এশিয়ার সীমানা নির্ধারণ করেছিলেন এবং বিদেশি আধিপত্যবিরোধী বীর হিসেবে তিনি পারস্যের ইতিহাসে সমাদৃত। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, তেহরানের এই দাবি কিছুটা সতর্কতার সঙ্গে দেখা উচিত, কারণ দেশটির সামরিক অগ্রগতির অনেক তথ্যই নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা কঠিন। কিংস কলেজ লন্ডনের সিনিয়র লেকচারার মার্ক হিলবোর্ন জানান, এই ব্যবস্থা সম্পর্কে ‘নিরপেক্ষ তথ্য খুব কম’ থাকলেও ইরান ক্ষেপণাস্ত্রের নকশায় এখন স্বনির্ভর এবং যুদ্ধের অর্থনৈতিক কৌশল বদলে সস্তা সমরাস্ত্র দিয়ে জটিল মার্কিন ব্যবস্থাকে ঝুঁকিতে ফেলছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা, ‘আরাশ-ই কামানগির’ মূলত ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য এমন এক বহনযোগ্য ‘পপ-আপ’ ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা, যা খুব সহজে ও দ্রুত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়া যায়। এটি প্রথাগত রাডারের ওপর নির্ভর না করে মূলত ইলেকট্রো-অপটিক্যাল বা তাপ শনাক্তকরণ (হিট-সিকিং) প্রযুক্তির সাহায্যে নিখুঁত আঘাত হানে। ফ্রান্সের সায়েন্সেস পো ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক নিকোল গ্রাজিউস্কি বলেন, পশ্চিমাদের ধারণা ভুল প্রমাণ করে শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষেত্রে ইরান আসলে নিজেদের প্রত্যাশার চেয়েও ভালো সামরিক সহনশীলতা ও গতিশীলতা প্রদর্শন করেছে।
