মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে অমরত্ব অর্জন এবং বার্ধক্য জয় করার লক্ষ্যে ২৬ বিলিয়ন (২ হাজার ৬০০ কোটি) ডলারের একটি বিশাল রাষ্ট্রসমর্থিত প্রকল্প চালু করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রেমলিন-সমর্থিত এই উচ্চাভিলাষী বৈজ্ঞানিক উদ্যোগটি মূলত বার্ধক্য রোধে পুতিনের দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত আগ্রহ ও আকাঙ্ক্ষা থেকেই একটি প্রধান রাষ্ট্রীয় ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্পে রূপ নিয়েছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে বেইজিংয়ে এক সামরিক কুচকাওয়াজ চলাকালে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে পুতিনের একটি ঘরোয়া আলাপচারিতা ফাঁস হয়ে যায়, যেখানে তিনি প্রথম এই সম্ভাবনার কথা বলেন। সম্প্রতি রাশিয়া সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নিউ হেলথ প্রিজারভেশন টেকনোলজিস’ নামের এই প্রকল্পের ঘোষণা দিয়ে জানায়, তাদের বিজ্ঞানীরা কোষের বার্ধক্য ধীরগতির করার জন্য একটি বিশেষ জিন-থেরাপি চিকিৎসা তৈরি করছেন, যা মানবজাতিকে দীর্ঘায়ু করতে ভূমিকা রাখবে।
এই প্রকল্পের আওতায় মূলত থ্রিডি বায়োপ্রিন্টিং (জীবন্ত টিস্যুর থ্রিডি প্রিন্ট করা) এবং জেনোট্রান্সপ্ল্যান্টেশন বা জিনগতভাবে মানুষের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিশেষ জাতের ছোট শূকরের শরীরের ভেতরে মানুষের অঙ্গ তৈরি করার মতো অভিনব প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। রুশ বিজ্ঞানীদের দাবি, তাঁরা ইতিমধ্যে পরীক্ষাগারে ইঁদুরের থাইরয়েড গ্রন্থি ও মানুষের তরুণাস্থি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এই প্রযুক্তির সাহায্যে সরাসরি মানবদেহের অঙ্গ প্রতিস্থাপন শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পুতিনের এই দীর্ঘায়ু অভিযানের নেতৃত্বে রয়েছেন তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ দুই ব্যক্তি। এর মধ্যে জিনপ্রযুক্তি ও হরমোন বিশেষজ্ঞ হিসেবে এই কর্মসূচির পুরো তদারকি করছেন পুতিনের নিজের কন্যা মারিয়া ভোরোনৎসোভা। তাঁর সাথে যৌথভাবে এই মহাযজ্ঞের দায়িত্বে রয়েছেন সোভিয়েত আমলের পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র কুর্চাতভ ইনস্টিটিউটের প্রধান এবং বিতর্কিত পদার্থবিদ মিখাইল কোভালচুক, যিনি দাবি করেন যে অমরত্ব কঠিন হলেও মানুষকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মাধ্যমে মেরামত করার সক্ষমতা সামনে নিঃসন্দেহে বৃদ্ধি পাবে।
তবে পশ্চিমা ধনকুবের জেফ বেজোস বা স্যাম অল্টম্যানদের অর্থায়নে পরিচালিত দীর্ঘায়ু গবেষণার মতো ক্রেমলিনের এই প্রকল্পের কোনো বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক পিয়ার-রিভিউড জার্নালে এখনো প্রকাশিত হয়নি। ইউক্রেন আক্রমণের পর রাশিয়া ছেড়ে চলে যাওয়া দেশিটির অন্যতম জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ওস্ত্রভস্কি মন্তব্য করেছেন, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো প্রকাশনা না থাকার অর্থ হলো এখানে বাস্তবসম্মত কোনো ফলাফল নেই। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন রুশ বিজ্ঞানীরা মূলত কোটি কোটি ডলারের তহবিল বরাদ্দ পেতেই পুতিনকে অবাস্তব স্বপ্ন দেখাচ্ছেন।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, বার্ধক্য ও মৃত্যুকে জয় করার এই তীব্র আকাঙ্ক্ষা রুশ শাসকদের জন্য নতুন কিছু নয়। এর আগে ১৯২০-এর দশকে সোভিয়েত বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার বোগদানভ রক্ত পরিবর্তনের মাধ্যমে তারুণ্য ধরে রাখার পরীক্ষা চালাতে গিয়ে নিজের শরীরেই বিষক্রিয়ায় ৫৫ বছর বয়সে মারা যান। পরবর্তীতে জোসেফ স্তালিনের প্রশংসাধন্য চিকিৎসক ওলেকসান্দর বোগোমলেটস এবং পুতিনের ব্যক্তিগত জেরন্টোলজিস্ট ভ্লাদিমির খাভিনসন মানুষকে ১২০ থেকে ১৫০ বছর বাঁচিয়ে রাখার দাবি করলেও, তাঁরা নিজেরা যথাক্রমে ৬৫ ও ৭৭ বছর বয়সে মারা যান।
বর্তমানে ৭৩ বছর বয়সি পুতিন দীর্ঘদিন ধরে খালি গায়ে শিকার করে কিংবা বরফশীতল পানিতে ডুব দিয়ে নিজের ‘চিরতরুণ’ ইমেজ ধরে রাখার চেষ্টা করলেও রাশিয়ার বাস্তব চিত্র বেশ ভিন্ন। উন্নত বিশ্বের তুলনায় রাশিয়ার গড় আয়ু অনেক কম; যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে গড় আয়ু ৭৬ বছর এবং পশ্চিম ইউরোপে ৮০ বছরের বেশি, সেখানে রাশিয়ায় পুরুষদের গড় আয়ু মাত্র ৬৮ বছর। ফলে বিশ্লেষকদের মতে, ক্রেমলিনের জন্য দেশের নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করা যতটা সহজ, জীববিজ্ঞানের অমোঘ নিয়ম অর্থাৎ মৃত্যুকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভবত ততটাই কঠিন।
