জনসংখ্যা ১ কোটির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার প্রস্তাব নিয়ে আজ রোববার গণভোটে যাচ্ছে সুইজারল্যান্ড। প্রস্তাবটি অনুমোদন পেলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের অন্যতম কঠোর পদক্ষেপ হিসেবে এটি বিবেচিত হবে।
গণভোটকে ঘিরে দেশটিতে ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সমর্থকদের মতে, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এবং নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান অক্ষুণ্ন রাখতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির লাগাম টানা জরুরি। অন্যদিকে বিরোধীরা সতর্ক করে বলছেন, এমন সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুইজারল্যান্ডকে চাপে ফেলতে পারে।
ডানপন্থি রাজনৈতিক দল সুইস পিপলস পার্টি সমর্থিত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের জনসংখ্যা কোনোভাবেই ১ কোটির বেশি হতে পারবে না।
এ পরিকল্পনা অনুযায়ী, জনসংখ্যা ৯৫ লাখে পৌঁছানোর পর থেকেই সরকারকে বৃদ্ধির হার কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের অনুমোদন সীমিত করা, বিদেশি কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের দেশে আনার ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
এছাড়া জনসংখ্যা ১ কোটিতে পৌঁছে গেলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বিদ্যমান কিছু চুক্তি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন হতে পারে বলেও প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রস্তাবের সমর্থকদের দাবি, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও পরিবহন ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ছাড়া জীবনযাত্রার মান ধরে রাখা সম্ভব হবে না।
তবে বিরোধীরা বলছেন, পরিকল্পনাটি বাস্তবসম্মত নয় এবং অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের মতে, অভিবাসন সীমিত করলে শ্রমবাজার, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
সুইস সরকার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং শ্রমিক ইউনিয়ন ইতোমধ্যে এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, প্রস্তাবটি কার্যকর হলে স্বাস্থ্যসেবা, আতিথেয়তা খাত এবং বয়স্কদের সেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে শ্রমিক সংকট দেখা দিতে পারে। কারণ এসব খাতে বিপুলসংখ্যক বিদেশি কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন।
তাদের মতে, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের সম্পর্কেও টানাপোড়েন সৃষ্টি হতে পারে। উল্লেখ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন দেশটির সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার।
২০০২ সালে সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭৩ লাখ। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৯১ লাখে পৌঁছেছে। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ বিদেশে জন্মগ্রহণকারী।
প্রস্তাবের সমর্থকরা বলছেন, এই জনসংখ্যা বৃদ্ধি আবাসন সংকট, বাড়িভাড়া বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, এসব সমস্যার পেছনে শুধু অভিবাসন নয়, অর্থনৈতিক ও নীতিগত নানা কারণও দায়ী।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপে গণভোটে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। যদিও প্রস্তাবের বিরোধীরা সামান্য এগিয়ে রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এখনও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোটার সিদ্ধান্তহীন অবস্থায় রয়েছেন। ফলে গণভোটের ফল কোন দিকে যাবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অনিশ্চিত গণভোটগুলোর একটি।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই গণভোট শুধু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন নয়; বরং সুইজারল্যান্ডের জাতীয় পরিচয়, অভিবাসন নীতি এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পথরেখা নিয়েও গভীর বিতর্কের প্রতিফলন।
তথ্যসূত্র: সামা টিভি
