জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে কুমিল্লা জেলা পরিষদ থেকে ২৫ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন পরিষদের বর্তমান প্রশাসক মো. মোস্তাক মিয়া। কেন্দ্রীয় বিএনপির সহসাংঠনিক সম্পাদক পদে থাকা মোস্তাক মিয়ার দাবি, আসিফ মাহমুদ ১৫ কোটি এবং হাসনাত আবদুল্লাহ ১০ কোটি টাকা নিয়ে গেছেন। তবে জুলাই আন্দোলনের সামনের সারির এই দুই নেতার বিরুদ্ধে করা এমন মন্তব্যের ৫১ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হওয়ার পর রাতেই এর তীব্র প্রতিবাদ ও ব্যাখ্যা দিয়েছেন তাঁরা।
শনিবার দুপুরে কুমিল্লা শিল্পকলা একাডেমিতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত একটি আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মোস্তাক মিয়া এই বিতর্কিত মন্তব্যটি করেন। তিনি বলেন, জেলা পরিষদের নিজস্ব রাজস্বের টাকা থেকে মুরাদনগরের আসিফ মাহমুদ ১৫ কোটি এবং হাসনাত আবদুল্লাহ ১০ কোটি টাকা নিয়ে গেছেন। তিনি আরও মন্তব্য করেন, তারা বৈষম্যবিরোধী সমন্বয়ের রাজনীতির কথা বললেও তাদের মধ্যে সেই আদর্শ ছিল না। এই বক্তব্যটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া নিজের ফেসবুক পেজে লাইভে এসে জেলা পরিষদ প্রশাসকের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, জেলা পরিষদের কোন অর্থ এডিপি (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি) আর কোনটি নিজস্ব রাজস্ব তহবিল—সেই সাধারণ জ্ঞান প্রশাসকের থাকা উচিত। আসিফ মাহমুদ স্পষ্ট করেন যে, তিনি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালে সব উপজেলাতেই বিশেষ বরাদ্দ দিয়েছিলেন এবং তারই অংশ হিসেবে কুমিল্লা জেলা পরিষদের মাধ্যমে মুরাদনগর ও দেবিদ্বারেও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এই সব টাকা সম্পূর্ণ বিধি মোতাবেক বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করা হয়েছে, যার সুনির্দিষ্ট নথি জেলা পরিষদেই সংরক্ষিত আছে।
অনুরূপভাবে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহও তাঁর ফেসবুক পেজে এক দীর্ঘ পোস্টের মাধ্যমে জেলা পরিষদ প্রশাসকের দেওয়া বক্তব্যকে ‘স্পষ্ট মিথ্যাচার’ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যায়িত করেন। হাসনাত আবদুল্লাহ জানান, জেলা পরিষদের নিজস্ব রাজস্ব খাতের সঙ্গে এই অর্থের কোনো সম্পৃক্ততাই নেই, বরং এটি স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে দেওয়া বিশেষ এডিপি বরাদ্দ যা জেলা পরিষদের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছে। একই সাথে তিনি মোস্তাক মিয়ার দেওয়া তথ্যের ভুল সংশোধন করে বলেন, দেবিদ্বারের জন্য ১০ কোটি টাকা নয়, মূলত ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
হাসনাত আবদুল্লাহ তাঁর পোস্টে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রশাসকের বক্তব্যের ধরণ এমন ছিল যেন মনে হবে টাকাটা তাঁরা নিজেরা পকেটস্থ করেছেন। অথচ এই অর্থ ব্যক্তি হিসেবে তাঁদের কাছে যায়নি, বরং দেবিদ্বার উপজেলার মোট ৪২টি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সরাসরি সরকারি নিয়ম মেনে ব্যয় করা হয়েছে এবং প্রতিটি টাকার হিসাব সরকারি নথিতে রয়েছে। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকরা ফোন করলে প্রশাসক নিজেও স্বীকার করেন যে অর্থটি উন্নয়ন কাজের জন্যই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল এবং সাংবাদিকরা হয়তো তাঁর বক্তব্য পুরোপুরি প্রকাশ করেনি, যা প্রশাসকের পূর্বের রাজনৈতিক বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত।
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতির পর রাতে জেলা পরিষদ প্রশাসক মোস্তাক মিয়া কিছুটা সুর নরম করে নিজের দেওয়া আগের বক্তব্যের নতুন ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, নিজস্ব রাজস্ব তহবিল আর এডিপির বিশেষ বরাদ্দ—সবই তো শেষ পর্যন্ত সরকারি টাকা। তবে তিনি আলটিমেটাম দিয়ে জানান যে, মুরাদনগর ও দেবিদ্বার এই দুই উপজেলায় বিশেষ বরাদ্দের অধীনে নেওয়া সবকটি উন্নয়ন প্রকল্প কঠোরভাবে তদন্ত করা হবে এবং তদন্তে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি খুঁজে পাওয়া গেলে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
